
বিশেষ প্রতিনিধি, গাজীপুর
হাজার টাকার নোটে মেলে ফাইল অনুমোদন—ভিডিও প্রকাশের পর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সাংবাদিকদের চাপ দেওয়ার অভিযোগ গাজীপুর জেলা খাদ্য অধিদপ্তর কার্যালয়ে কর্মরত অফিস সহকারী ও প্রহরী মোঃ আসাদ মিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ফাইল ও কাগজপত্রের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবি করা হয়। এমনকি অভিযোগ রয়েছে—হাজার টাকার নোট ছাড়া ফাইলের কাজ এগোয় না।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টাকা না দিলে ফাইলের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে কাজ বিলম্বিত করা হয়। আর চাহিদামতো অর্থ দেওয়া হলে দ্রুতই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়।ৎজাতীয় সাপ্তাহিক এশিয়া বার্তা-এর কার্যালয়ে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে কথিত অর্থ লেনদেনের দৃশ্য রয়েছে বলে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের দাবি।
ভিডিওতে একজন ভুক্তভোগীকে তার কাজ দ্রুত করে দেওয়ার অনুরোধ করতে শোনা যায়। তবে ভিডিওটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় সাপ্তাহিক এশিয়া বার্তার পক্ষ থেকে মোঃ আসাদ মিয়ার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি দাবি করেন, এটি আমার নিজস্ব ব্যক্তিগত লেনদেন। তখন প্রশ্ন করা হয়—সরকারি কার্যালয়ে ব্যক্তিগত লেনদেনের প্রয়োজন কেন? জবাবে তিনি বলেন, আপনাদের যা কিছু করার আছে করতে পারেন, সমস্যা নেই।
পরবর্তীতে ক্যামেরার সামনে এসে আসাদ মিয়া অভিযোগটিকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভিডিওতে যে কথিত অর্থ লেনদেনের দৃশ্য রয়েছে, সেটি আসলে কীসের লেনদেন এবং এর সঙ্গে সরকারি দাপ্তরিক কাজের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না?
এর উত্তর মিলতে পারে নিরপেক্ষ তদন্তেই।
প্রহরী হয়ে কম্পিউটারে দাপ্তরিক কাজ উঠছে প্রশ্ন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, প্রহরী পদে কর্মরত একজন কর্মচারী কীভাবে নিয়মিত কম্পিউটারের সামনে বসে দাপ্তরিক কাজ করছেন? তিনি কি তার নির্ধারিত দায়িত্বের বাইরে কাজ করছেন? নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনেই এসব দায়িত্ব পালন করছেন?
এ বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা অবশ্যই প্রকাশ করা হবে।
নিউজ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের চাপ দেওয়ার অভিযোগ, জাতীয় সাপ্তাহিক এশিয়া বার্তা কর্তৃপক্ষের দাবি, আসাদ মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ভিডিও তাদের হাতে আসার পর কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দিয়েছেন।
এমনকি একাধিকবার ফোন করে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বলা হয়েছে বলেও দাবি পত্রিকা কর্তৃপক্ষের। কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চাওয়ার পরিবর্তে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার জন্য সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কেন?
এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারজমিন বার্তা-এর জেলা প্রতিনিধি মোঃ হাফিজুর রহমানের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে আসাদ মিয়ার ঘুষের অভিযোগ নিয়ে একটি কথিত ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয় সামনে আসে।
এশিয়া বার্তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রথমে প্রতিবেদনটি ওই প্রতিনিধির ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশ করা হয় এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের লোগো ও টেমপ্লেট ব্যবহার করা হয়েছে।
পত্রিকা কর্তৃপক্ষের দাবি, বিষয়টি জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমদিকে তারা এ বিষয়ে অবগত নয় বলে জানায়।
পরবর্তীতে একই ধরনের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজেও প্রকাশিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন লোগো ও টেমপ্লেট ব্যবহারের অনুমতি ছিল কি?
এখানেই উঠছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একজন জেলা প্রতিনিধি কি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল লোগো, টেমপ্লেট ও পরিচয় ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন?
যদি অনুমতি থাকে সেটি কি প্রতিষ্ঠানের লিখিত বা মৌখিক অনুমোদনে করা হয়েছে?
আর যদি অনুমতি না থাকে—তাহলে প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ও পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আইডি থেকে সংবাদ প্রকাশের দায়ভার কার?
এসব প্রশ্নের পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ঘুষ বাণিজ্য নাকি ব্যক্তিগত লেনদেন তদন্তেই মিলবে উত্তর
একদিকে ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অন্যদিকে ভিডিও ফুটেজ, আবার অভিযুক্তের দাবি ব্যক্তিগত লেনদেন।অন্যদিকে আসাদ মিয়া পরবর্তীতে অভিযোগকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলছেন।
তাই বিষয়টি এখন আর শুধু অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ফাইল, নথিপত্র, সিসিটিভি ফুটেজ, দায়িত্ব বণ্টনের কাগজপত্র, ভিডিও ফুটেজ এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য যাচাই করা যেতে পারে।
জাতীয় সাপ্তাহিক এশিয়া বার্তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে সংবাদ প্রকাশ করা তাদের উদ্দেশ্য নয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য প্রকাশ এবং সরকারি দপ্তরে অনিয়ম থাকলে তা জনসম্মুখে তুলে ধরাই সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করার জন্য কোনো ধরনের চাপ বা হুমকি গ্রহণযোগ্য নয় বলেও জানিয়েছে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ।
মোঃ আসাদ মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দোষী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না।
এখন দেখার বিষয়—
হাজার টাকার নোটে কি সত্যিই ফাইলের গতি বাড়ে, নাকি পুরো ঘটনাটিই ভুল বোঝাবুঝি? সত্যটা বেরিয়ে আসুক নিরপেক্ষ তদন্তে।