রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুড়িগ্রাম ব্যাটালিয়ন (২২ বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ৩২ লাখ টাকা মূল্যের ভারতীয় পন্য  মুকসুদপুরে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও ছানি অপারেশনের লক্ষ্যে রোগী বাছাই ক্যাম্প অনুষ্ঠিত কক্সবাজারে আইফোনসহ ৬০টি হারানো মোবাইল উদ্ধার, মালিকদের কাছে হস্তান্তর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে প্রথমবারের মতো ধামাইল কর্মশালা অনুষ্ঠিত দীর্ঘ ৫ (পাঁচ) বছর যাবৎ ব্রিজের কাজে বেহাল অবস্থায় জনদূর্ভূগ পোহাতে হচ্ছে। ঢাকার ধামরাই বাটার গেট সংলগ্ন বাস,প্রাইভেটকারও মোটরসাইকেল মুখোমুখি সং ঘ র্ষে ২ জনের মৃ ত্যু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ১২ সংস্হার শীর্ষ পদে বিএনপির ১২ নেতা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। দেশ প্রতিদিন পত্রিকার বিরুদ্ধে আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ, অর্থ ফেরত ও পত্রিকার নিবন্ধন বাতিল করতঃ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক যাদুর শাস্তি চায় ভুক্তভোগীরা। উখিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে ১০ হাজার ইয়াবাসহ প্রাইভেটকার জব্দ, মাদক কারবারি গ্রেপ্তার সাংবাদিক এম কাজল খানের ওপর নৃশংস হামলা প্রধান অভিযুক্ত নয়ন পলাতক, গ্রেপ্তারে চলছে অভিযান

বোনের বিয়ের আসরেই নিভে গেল একমাত্র ভাইয়ের প্রাণপ্রদীপ হাটহাজারীতে ড্রাম ট্রাকের চাপায় স্কুলছাত্রের করুণ মৃত্যু

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
  • ৪৯ বার পড়া হয়েছে
বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্লাবের সামনেই রাস্তা পারাপারের সময় ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারায় মো. সামির। ছবি:

আরমান হোসেন ফয়সাল, লোহাগাড়া প্রতিনিধি (চট্টগ্রাম)

একটি মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য মেয়ের বিয়ের দিনটি অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত এবং আনন্দের। ঘরজুড়ে আলপনা, আলোকসজ্জা, সানাইয়ের সুর আর আত্মীয়-স্বজনের পদচারণায় মুখরিত চারপাশ। চট্টলার ঐতিহ্যবাহী উপজেলা হাটহাজারীতেও আজ একটি পরিবারে তেমনি এক আনন্দের বন্যা বইছিল। আজ ছিল পরিবারের একমাত্র আদরের মেয়ের বিয়ের দিন। কিন্তু কে জানত, বিধাতার এক নির্মম পরিহাসে এই অনাবিল আনন্দের দিনটিই মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেবে এক আজীবনের বুকফাটা কান্না আর মহাশোকে?

বোনের বিয়ের ক্লাবের ঠিক সামনেই রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি ড্রাম ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র মো. সামির। যে ভাইটির আজ বোনের লাল বেনারসি শাড়ির আঁচল ধরে বিয়ের মণ্ডপে যাওয়ার কথা ছিল, যে ভাইয়ের আজ নতুন দুলাভাইকে বরণ করে নেওয়ার কথা ছিল, সেই ভাইয়ের নিথর রক্তাক্ত দেহই দেখতে হলো নতুন কনেসহ পুরো পরিবার ও স্বজনদের। আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারের (ক্লাব) সামনে এই বুক কাঁপানো দুর্ঘটনাটি ঘটে।

ঘটনার বিবরণ ও আনন্দের মাঝে ট্র্যাজেডি: স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত মো. সামির (১৩) স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী এবং ওই পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তান ছিল। আজ তার বড় বোনের বিয়ের জমকালো অনুষ্ঠান ঠিক করা হয়েছিল হাটহাজারীর একটি স্থানীয় কমিউনিটি ক্লাবে। সকাল থেকেই বরযাত্রী এবং মেহমানদের স্বাগত জানাতে ক্লাবের গেটে ও ভেতরে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। সামিরও তার বোনের জীবনের এই বিশেষ দিনটি নিয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত ছিল। সে নতুন পোশাক পরে উৎসবের আমেজে ক্লাবের আশেপাশে তদারকি করছিল।

দুপুরের দিকে একটি বিশেষ প্রয়োজনে সামির ক্লাবের প্রধান ফটকের সামনের সড়কটি পার হতে যায়। ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে আসা অত্যন্ত দ্রুত ও বেপরোয়া গতির একটি বালুবাহী ড্রাম ট্রাক কোনো প্রকার ব্রেক না চেপে সরাসরি সামিরকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কা খেয়ে সামির ছিটকে সড়কের ওপর পড়ে গেলে ট্রাকের ভারী চাকা তার শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

সানাইয়ের সুর থামিয়ে কান্নার রোল: দুর্ঘটনার শব্দ শুনে ক্লাবের ভেতর থেকে কনের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন এবং কনে নিজে বিয়ের সাজে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এসে সড়কের ওপর একমাত্র ছোট ভাইয়ের রক্তাক্ত ও নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে তারা স্তব্ধ হয়ে যান। মুহূর্তের মধ্যে ক্লাবের সানাইয়ের সুর ও উৎসবের কোলাহল এক নিমিষেই চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বাতাস ভারী করা কান্না আর আহাজারি।

বিয়ের জমকালো আলোকসজ্জা যেন এক নিমেষেই অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যায়। কনে তার একমাত্র ভাইয়ের লাশের ওপর আছড়ে পড়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। আনন্দের উৎসব রূপ নেয় এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডিতে। উপস্থিত বরযাত্রী ও শত শত মেহমানও এই দৃশ্য দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বিয়ের ভোজের আনন্দ পরিণত হয় শোকের মাতমে।

পরিবার ও স্বজনদের অপূরণীয় ক্ষতি: সামিরের এই অকাল মৃত্যু শুধু একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, এটি একটি চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাওয়া পরিবারের গল্প। কারণ, বোনদের মাঝে সামিরই ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র চোখের মণি এবং বংশের প্রদীপ। তাকে নিয়ে পরিবারের ছিল অনেক স্বপ্ন ও আশা। যে দিনটি স্মরণীয় হওয়ার কথা ছিল জীবনের সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হিসেবে, সেই দিনটিই এখন এই পরিবারের জন্য চিরদিনের জন্য হয়ে রইল কলিজার টুকরো ছোট ভাইকে হারানোর এক অসহনীয় ও জীবন্ত কষ্টের কালরাত্রি। এমন মর্মান্তিক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না পাড়া-প্রতিবেশীরা। স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউ।

ঘাতক ট্রাক আটক, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী: এদিকে দুর্ঘটনার পরপরই হাটহাজারী এলাকার সাধারণ মানুষ ও বিক্ষুব্ধ জনতা ধাওয়া করে ঘাতক ড্রাম ট্রাকটিকে আটক করতে সক্ষম হলেও চালক ও তার সহকারী সুকৌশলে পালিয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনার এই খবর পেয়ে হাটহাজারী থানা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের একটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ সামিরের মরদেহটি উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাটহাজারীর এই সড়কে বেপরোয়া ড্রাম ট্রাকের তাণ্ডব দিন দিন বেড়েই চলেছে। এরা সাধারণ মানুষের জীবনকে কোনো পাত্তাই দেয় না। আজ একটা পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল এই চালকের অসতর্কতার কারণে। আমরা এই ঘাতক চালকের ফাঁসি চাই।”

পুলিশের বক্তব্য: হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হৃদয়বিদারক। আমরা খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। ঘাতক ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। চালককে গ্রেফতারের জন্য আমাদের অভিযান চলছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এই ঘটনার পর থেকে পুরো হাটহাজারী ও লোহাগাড়া এলাকায় এক গভীর শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews