
আরমান হোসেন ফয়সাল
ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া সাধারণ বিস্ফোরণ ছিল না। এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুসংগঠিত, সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বনির্ভর একটি সফল গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার এই রক্তক্ষয়ী ও গৌরবোজ্জ্বল আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যিনি পর্দার আড়ালে থেকে চট্টগ্রামকে পথ দেখিয়েছেন, রাজপথকে উত্তপ্ত রেখেছেন এবং প্রতিটি কর্মীকে আগলে রেখেছেন—তিনি আর কেউ নন, তিনি চট্টগ্রামের গর্ব, চট্টলার গণমানুষের অবিচল অভিভাবক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর হেলাল। তাঁর সঙ্গে মাঠের নেতৃত্বে নির্ভীকভাবে লড়াই চালিয়ে গেছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ।
একটি সফল আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক রণকৌশল, দক্ষ সমন্বয় এবং নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা। জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই তিনটি বিষয়ের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল। ব্যারিস্টার মীর হেলাল কেবল দূর থেকে আন্দোলনের সংহতি প্রকাশ করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রধান কৌশলবিদ বা ‘রোডম্যাপ’ রচয়িতা। চট্টগ্রামের প্রতিটি ব্লকেড, গণমিছিল, অবস্থান কর্মসূচি কিংবা আকস্মিক বিক্ষোভ—কোথা থেকে শুরু হবে, কোন রুট দিয়ে অগ্রসর হবে এবং কর্মসূচির পর কর্মীরা কীভাবে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে—তার প্রতিটি সূক্ষ্ম সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে।
যখন ফ্যাসিবাদের পেটোয়া বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চারদিক থেকে নির্বিচারে গুলি আর গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছিল, তখনো ব্যারিস্টার মীর হেলাল মাঠের যোদ্ধাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি একদিকে ছিলেন মাঠের লড়াকু সৈনিকদের অদৃশ্য ঢাল, অন্যদিকে দূর থেকে সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এক অতন্দ্র প্রহরী। যখন চারদিকে শুধু তাজা বুলেট আর টিয়ারশেলের ধোঁয়া, তখন মীর হেলাল ভাইয়ের একটি ফোন কল আমাদের শতগুণ সাহস বাড়িয়ে দিত। তিনি আমাদের শুধু নির্দেশ দেননি, আমাদের জীবন রক্ষার সুরক্ষাকবচও ছিলেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মীবৃন্দ।
এই গণআন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বয় সাধন। চট্টগ্রামে এই গুরুদায়িত্বটি অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেছেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল। আন্দোলনকে বেগবান করতে এবং ছাত্র-জনতার দাবিকে একসূত্রে গাঁথতে তিনি দিনরাত সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন। একই সাথে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতিটি বার্তা ও দিকনির্দেশনা যাতে তৃণমূলের প্রতিটি কর্মীর মাঝে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তা নিশ্চিত করেছিলেন এই তরুণ ও দূরদর্শী ব্যারিস্টার। তাঁর বলিষ্ঠ ও সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল, যা পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানকে পূর্ণতা দেয়।
আন্দোলনের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন অনেক বড় বড় এবং সুপরিচিত নেতা নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল ফোন বন্ধ করে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কঠিন ও অন্ধকার সময়েও ব্যতিক্রম ছিলেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল। তিনি নিজের জীবনের পরোয়া না করে ২৪ ঘণ্টা মোবাইল খোলা রেখেছিলেন। প্রতি মুহূর্তে খোঁজ নিয়েছেন কোন কর্মী কোথায় আছেন, কে আহত হয়েছেন, কার বাসায় পুলিশ রেইড দিচ্ছে। নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তিনি আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে বিপুল আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং মাঠের লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করতে তিনি পকেটের টাকা অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সংকটে পড়া প্রতিটি কর্মীর আশ্রয়স্থল।
এই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আমাদের মতো বহু নেতাকর্মীকে চড়া মূল্য চোকাতে হয়েছে। ফ্যাসিবাদের রক্ষীবাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা আমার খোঁজে আমার বাড়িতে বারবার তাণ্ডব চালিয়েছে। আমাকে না পেয়ে আমার সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছোট ভাইকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিক ও নৃশংস নির্যাতন করেছে। আমাদের পুরো পরিবারকে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল। মাসের পর মাস আমরা নিজেদের বাড়িতে ঘুমাতে পারিনি।
কিন্তু সেই চরম দুর্যোগ ও অন্ধকারের দিনগুলোতে আমাদের মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো দাঁড়িয়েছিলেন একজনই—ব্যারিস্টার মীর হেলাল ভাই। তিনি আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন এবং আমাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর এই অবদান কোনোদিন ভোলার নয়। তিনি শুধু আমাদের নেতা নন, তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই মরণজয়ী যুদ্ধের আগুন জ্বালানো এক উজ্জ্বল বাতিঘর।
জুলাই আন্দোলনের সফল সমাপ্তি ঘটেছে। দেশ আজ স্বৈরাচারমুক্ত। কিন্তু এই স্বাধীনতার পেছনে ব্যারিস্টার মীর হেলালের মতো যে সমস্ত অন্তরালের নায়কেরা নিজেদের জীবন ও পরিবারকে বাজি রেখে লড়াই করেছেন, তাঁদের অবদানকে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখতে হবে। চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের রাজনীতিতে তিনি আজ এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। ব্যারিস্টার মীর হেলাল ও এরশাদ উল্লাহর মতো নির্ভীক ও ত্যাগী নেতাদের হাত ধরেই আগামী দিনে চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াই আরও বেগবান হবে—এটাই আজ চট্টলাবাসীর বিশ্বাস ও প্রত্যাশা।