
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, ঢাকা জেলা
দেশের বর্তমান গণমাধ্যম পরিস্থিতি, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকদের একটি প্রতিনিধি দল। আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়স্থ কার্যালয়ে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের পক্ষ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যা মামলাসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ও হয়রানির শিকার ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তালিকাটি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিয়েছেন।
দুপুরে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদউর রহমান। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বৈঠকে অংশ নেন।
অন্যদিকে, দেশের সংবাদপত্র ও সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর পক্ষে প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউএজ (New Age) সম্পাদক নূরুল কবির এবং সাধারণ সম্পাদক ও বনিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। প্রতিনিধি দলে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশক ও সম্পাদক মাহফুজ আনাম, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন, সুপ্রভাত বাংলাদেশ সম্পাদক রুশো মাহমুদ এবং দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোঃ মোজাম্মেল হক। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সম্পাদকদের সম্মানার্থে এক মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন এবং অনানুষ্ঠানিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশক ও সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি হস্তান্তরকৃত তালিকার বিবরণ দিয়ে বলেন, “আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলার একটি প্রাথমিক তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে দিয়েছি। আমাদের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের মামলা রয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে ৯৪ জন সাংবাদিককে সরাসরি হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে।
মাহফুজ আনাম আরও স্পষ্ট করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা যে তালিকাটি দিয়েছি, তা যে একেবারেই চূড়ান্ত বা সম্পূর্ণ, তা আমরা দাবি করছি না। মফস্বল বা দূরবর্তী অঞ্চলের অনেক তথ্য হয়তো এখনো অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। তবে আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে এই তালিকাটি প্রস্তুত করে জমা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এটি গ্রহণ করেছেন। তিনি তখনই তথ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জন্য। সরকার এ ব্যাপারে একটি ইতিবাচক ও কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।
গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর আলোকপাত করে এই জ্যেষ্ঠ সম্পাদক বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে হত্যা মামলা বা এত বিপুল সংখ্যক মামলা কোনোভাবেই একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়। এটি আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই উদ্বেগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বৈঠক শেষে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সম্পাদক পরিষদের নেতারা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের এই পেশাদারী উদ্বেগ এবং অনুভূতির সঙ্গে পুরোপুরি একমত পোষণ করেছেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এই তালিকাটি যাচাই করে দ্রুত ও কার্যকরী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো সাংবাদিক যেন অন্যায়ভাবে হয়রানির শিকার না হন, সে ব্যাপারে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
তথ্যমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নতুন সরকার গঠনের পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের গণমাধ্যম বা সংবাদ প্রকাশের ওপর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দৃশ্যমান বা অদৃশ্য হস্তক্ষেপ করা হয়নি। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের এই অবাধ সুযোগ বজায় রাখায় সম্পাদক পরিষদের সিনিয়র সাংবাদিক ও নেতৃবৃন্দ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক দল ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা প্রত্যাহারে সরকারের এই আশ্বাসের দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চান দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।