মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
জামালপুরে ঐতিহাসিক রায় গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড সাভারে ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযান হেমায়েতপুর থেকে ৬০ পিস ইয়াবাসহ পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী মোস্তফা গ্রেফতার কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া, পুরোনো বিতর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা উৎসবমুখর পরিবেশে ধামরাইয়ে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপিত আলোচনা সভা ও ঋণ বিতরণ ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের স্বস্তিতে পৌরসভার ৫টি সিলিং ফ্যান প্রদান টানা বর্ষণে টেকনাফের ওয়াব্রাং গ্রাম প্লাবিত পানিবন্দি শতাধিক পরিবার, চরম দুর্ভোগ সুবিপ্রবি ও ভিসি নিয়ে অপতথ্য, গুজব ও অপপ্রচারের সাথে ভিন্নমত কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস উখিয়া ও শহরে নারী-শিশুসহ নিহত ৯, বাড়ছে ঝুঁকি ধামরাই থানার কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক মতবিনিময় ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত মাদারীপুরে নকল মোড়কে ভেজাল খাদ্যপণ্য, আটক ২ জব্দ সব

গাজীপুরে সাংবাদিকতার আড়ালে হানি ট্র্যাপ ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য অবশেষে ছিনতাই মামলার জালে চালক মিলনসহ ৩ জন গ্রেফতার

  • প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:

গাজীপুর মহানগরের গাছা থানা এলাকায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে দুর্ধর্ষ এক ছিনতাইকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, একটি সুনির্দিষ্ট ও সংবেদনশীল ছিনতাইয়ের মামলার তদন্তের সূত্র ধরে এই অপরাধী চক্রকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে এক চরম চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর নেপথ্য কাহিনী। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন মো. মিলন মিয়া, যার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—তিনি স্থানীয় বিতর্কিত নারী সাংবাদিক বিলকিস আক্তার রুবির স্বামী। গ্রেফতারকৃত অন্য দুই সহযোগী হলেন মো. হাসান এবং মো. হৃদয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ এই সফল অভিযান পরিচালনা করে। বর্তমানে গাছা থানায় আটককৃতদের রেখে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে এবং পুরো ঘটনার মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে ব্যাপক পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সাংবাদিকতার আড়ালে অপরাধের নেটওয়ার্ক

পেশাগতভাবে মো. মিলন মিয়া একজন দূরপাল্লার বাস ড্রাইভার হলেও তার মূল দাপট ও অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল তার স্ত্রী বিলকিস আক্তার রুবির কথিত সাংবাদিকতার পরিচয়কে পুঁজি করে। স্থানীয়দের ভুরিভুরি অভিযোগ, মিলন মূলত একটি সুসংগঠিত ‘হানি ট্র্যাপ’  চক্রের মূল চালিকাশক্তি। এই চক্রটি নিরীহ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা, নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা এবং সর্বস্ব লুটে নেওয়ার কাজে লিপ্ত ছিল।

মিলনের পূর্ব অপরাধের ইতিহাস আরও অনেক বেশি ভয়ংকর। জানা গেছে, কিছুদিন আগে মিলন যে দূরপাল্লার বাসের ড্রাইভারি করছিলেন, সেই চলন্ত বাসের কন্ডাক্টরকে নির্মমভাবে গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে মেরে ফেলার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের সুস্পষ্ট দাবি, সেটি কোনো সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা ছিল না, বরং সেটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু সেই সময় দেশের প্রচলিত আইন ও পুলিশকে তোয়াক্কা না করে, নিজের স্ত্রীর কথিত সাংবাদিকতার ভয় দেখিয়ে এবং গণমাধ্যমের প্রভাব খাটিয়ে পুরো ঘটনাটিকে রাতারাতি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ফলে সে যাত্রায় পার পেয়ে গিয়ে মিলনের অপরাধের দুঃসাহস আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

রাত নামলেই শুরু হয় কথিত ‘সাংবাদিকতা’!

অনুসন্ধানে এবং স্থানীয় হকার ও বাস চালকদের সূত্রে জানা গেছে এক অদ্ভুত ও কলঙ্কজনক কাহিনী। সাধারণ গণমাধ্যমকর্মীরা যখন সারাদিনের কাজ শেষে রাতের বেলায় নীরবে ঘুমাতে যান, ঠিক তখনই কথিত সাংবাদিক বিলকিস আক্তার রুবির আসল ‘সাংবাদিকতা’র কাজ শুরু হয়। মাঝরাতে তাকে দেখা যায় গাজীপুর চৌরাস্তায়। সেখানে কোনো ক্যামেরা বা কলম-ডায়েরি নয়, বরং তার হাতে থাকে একটি শক্তিশালী লেজার লাইট! এই লেজার লাইট দিয়ে তিনি মাঝরাতে দূরপাল্লার এবং লোকাল গাড়িগুলোকে থামিয়ে সিরিয়াল দেওয়ার নামে প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে মেতে ওঠেন।

স্থানীয় সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, গভীর রাতে মহাসড়কে লেজার লাইট দিয়ে গাড়ির সিরিয়াল দেওয়া এবং সেখান থেকে ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে জোরপূর্বক আদায় করা কিসের সাংবাদিকতা? মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও এই তথাকথিত সাংবাদিকের নামে আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠিত বা মূলধারার গণমাধ্যমে একটিও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি। অথচ তিনি নিজেকে ক্রাইম ইনভেস্টিগেটর বা বড় মাপের সাংবাদিক দাবি করে বেড়ান। অনেকেই ভাবতেন, হয়তো তিনি রাতের গাজীপুরের কোনো বড় অপরাধ চক্রের ওপর ‘ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন’ বা গোপন অনুসন্ধান করছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের বাস্তব চিত্র বলছে, কোনো ক্রাইম নিউজ বা ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট তার মাধ্যমে কোনো দিন আলোর মুখ দেখেনি, যা কখনো সম্ভবও না। তার মূল লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকতার লোগো বা পরিচয় ব্যবহার করে গাজীপুর চৌরাস্তার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে দৈনিক এবং বাসের ড্রাইভার-হেল্পারদের কাছ থেকে প্রতি ট্রিপে ১০০-২০০ টাকা করে অবৈধ চাঁদা আদায় করা।

ফেসবুকের ভুল স্ট্যাটাস ও সাংবাদিক জাতির কলঙ্ক

ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির এই রক্তচোষা ও অবৈধ কালো টাকার অহংকারে অন্ধ হয়ে মেতে উঠেছিলেন এই দম্পতি। স্থানীয় সাংবাদিকদের একাংশ জানান, সাংবাদিক বিলকিস আক্তার রুবি তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে নিয়মিতভাবে সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এবং নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিভিন্ন অহংকারমূলক স্ট্যাটাস দিয়ে আসছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একজন সাংবাদিক দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও তার ফেসবুকের সেই স্ট্যাটাসগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে বানান ও বাক্য গঠনের ভুল লক্ষ্য করা যায়। এই ধরনের মূর্খতা এবং চরম অহংকারী আচরণ পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য এক বিশাল বড় কলঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসী এবং পেশাদার সাংবাদিকরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তীব্র ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন রেখেছেন—এগুলো যদি একজন সাংবাদিকের কাজ হয়, তবে এই মহান পেশা কি সমাজের কাছে কোনো সম্মান বয়ে আনছে, নাকি দিনের পর দিন এর মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এই ধরনের ভুঁইফোঁড় ও অপরাধী চক্রের কারণে মাঠপর্যায়ে সততার সাথে কাজ করা প্রকৃত সাংবাদিকদের জীবন আজ হুমকির মুখে এবং তাদের সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

আইনগত প্রক্রিয়া ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি

এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে আটককৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে দেশের প্রচলিত আইনি নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া এবং বিজ্ঞ আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আটককৃত মিলন, হাসান ও হৃদয় আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে পুলিশ জোর দিয়ে বলেছে যে, তাদের কাছে এই চক্রের অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এই ঘটনার একটি গভীর ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, শুধুমাত্র মাঠপর্যায়ের ছিনতাইকারী মিলনকে গ্রেফতার করলেই হবে না, বরং এর পেছনে তার স্ত্রী সাংবাদিক বিলকিস আক্তার রুবির কোনো প্রত্যক্ষ মদদ বা চাঁদাবাজির টাকার ভাগ রয়েছে কিনা, তাও কঠোরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে যারা মহাসড়কে ও ফুটপাতে চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এই পবিত্র পেশাকে নিজের অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সাহস না পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews