
মোহাম্মদ আরিফ
আষাঢ়ের বিদায়লগ্নে এসে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারে শুরু হয়েছে টানা ও মুষলধারে বৃষ্টিপাত। গত কয়েকদিন ধরে চলা এই অবিরাম বর্ষণের ফলে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের স্বাভাবিক জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে চরম ভোগান্তি ও দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং বেড়াতে আসা পর্যটকেরা। সড়কগুলোতে পানি জমে থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
একদিকে শহরের ভেতরে জলাবদ্ধতার কারণে ঘরের বাইরে বের হওয়াই দায় হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঝুঁকি। সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি রুখতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং ও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
সরেজমিনে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ লাবনী পয়েন্ট থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট পর্যন্ত প্রধান সড়কটি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পর্যটন জোনের হোটেল-মোটেল গলি, কলাতলী রোড এবং শহরের ভেতরের প্রধান প্রধান সংযোগ সড়কগুলো এখন পানির নিচে।
হঠাৎ করে সৃষ্টি হওয়া এই জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল দিনমজুর ও রিকশাচালকেরা। গণপরিবহন সংকটের কারণে অনেককে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত যানবাহন। অনেক এলাকায় নিচু বসতবাড়ি, কটেজ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বৃষ্টির নোংরা পানি ঢুকে পড়েছে। ফলে মালামাল নষ্ট হওয়াসহ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার জেলা ও এর আশপাশের উপজেলাগুলোতে অসংখ্য মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে এই পাহাড়গুলোর মাটি নরম হয়ে পড়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। বিশেষ করে শহরের লাইটহাউস, লিংক রোড, পিএমখালী, চিলড্রেন পার্ক সংলগ্ন এলাকা এবং উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে যেন মানুষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যায়। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, যারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পাহাড়ের ওপরে বা পাদদেশে অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে স্বেচ্ছাসেবক দল ও উদ্ধারকারী টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে হলেও ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকায় দমকা হাওয়া বয়ে যাওয়ার কারণে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত উত্তাল রয়েছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় জেলে ও মাছ ধরার ট্রলারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্ক বার্তা অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে গভীর সাগরে না গিয়ে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। অনেক ট্রলার ইতিমধ্যে বাঁকখালী নদী ও টেকনাফের বিভিন্ন ঘাটে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে এসেছে। তবে যারা গভীর সাগরে অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত উপকূলে ফেরার বার্তা পাঠানো হয়েছে।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং স্থানীয় আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রবল প্রভাব রয়েছে। এর ফলেই কক্সবাজার উপকূলসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে এই মাঝারি থেকে ভারী, আবার কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও অন্তত ৩ থেকে ৪ দিন এই বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। টানা বৃষ্টির কারণে কক্সবাজারের প্রধান নদীগুলোর পানির স্তরও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নদী পাড়ের বাসিন্দারা। সার্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room) খোলার প্রস্তুতিও চলছে।