মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জামালপুরে ঐতিহাসিক রায় গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলায় ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড সাভারে ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযান হেমায়েতপুর থেকে ৬০ পিস ইয়াবাসহ পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী মোস্তফা গ্রেফতার কর্মকর্তার বাধ্যতামূলক অবসর রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া, পুরোনো বিতর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা উৎসবমুখর পরিবেশে ধামরাইয়ে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপিত আলোচনা সভা ও ঋণ বিতরণ ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের স্বস্তিতে পৌরসভার ৫টি সিলিং ফ্যান প্রদান টানা বর্ষণে টেকনাফের ওয়াব্রাং গ্রাম প্লাবিত পানিবন্দি শতাধিক পরিবার, চরম দুর্ভোগ সুবিপ্রবি ও ভিসি নিয়ে অপতথ্য, গুজব ও অপপ্রচারের সাথে ভিন্নমত কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস উখিয়া ও শহরে নারী-শিশুসহ নিহত ৯, বাড়ছে ঝুঁকি ধামরাই থানার কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ক মতবিনিময় ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত মাদারীপুরে নকল মোড়কে ভেজাল খাদ্যপণ্য, আটক ২ জব্দ সব

কক্সবাজারে ভয়াবহ পাহাড়ধস উখিয়া ও শহরে নারী-শিশুসহ নিহত ৯, বাড়ছে ঝুঁকি

  • প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজারে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ধসে পড়া ঘরবাড়ি। ছবি

মোহাম্মদ আরিফ, জেলা প্রতিনিধি (কক্সবাজার)

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারে টানা কয়েকদিন ধরে চলছে রেকর্ড ভাঙা ভারী বর্ষণ। এই অবিরাম বৃষ্টির জেরে জেলাটিতে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের পৃথক চারটি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। মাটিচাপা পড়ে আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। নিখোঁজ ও আটকে পড়াদের উদ্ধারে এখনো তৎপরতা চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা।

সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত গভীর রাত থেকে শুরু করে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই পাহাড়ধসের ঘটনাগুলো ঘটে। এ ঘটনার পর পুরো জেলা জুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ধসের প্রথম বড় ঘটনাটি ঘটে সোমবার দিবাগত রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। গভীর রাতে যখন ক্যাম্পের বাসিন্দারা ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। কাঁচা ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে মাটির নিচে চাপা পড়ে।

খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন—মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের মাত্র চার বছর বয়সী শিশুসন্তান মোহাম্মদ আনাস। এ ঘটনায় কামাল হোসাইনের পরিবারের আরও দুজন গুরুতর আহত হন। তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “সংবাদ পাওয়ার পরপরই আমাদের উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মাটি কেটে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই এলাকায় আরও কোনো ঘর ঝুঁকিতে আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জামতলী ক্যাম্পের ঘটনার মাত্র ৩৫ মিনিট পর, রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সেখানে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে মোহাম্মদ রশিদের ঘরের ওপর। এতে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় একরাম (৭) নামের এক রোহিঙ্গা শিশু। ঘটনার পর স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজ চালিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।

এদিকে, দুর্যোগের রাত এখানেই শেষ হয়নি। রাত ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে ঘটে আরেকটি বড় ধরনের পাহাড়ধস। সেখানে পাহাড়ের মাটি চাপায় একসঙ্গে চারজন নিহত হন। নিহতরা হলেন—উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদ (৩)। ক্যাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এই ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যার অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের পরিবার ও ক্যাম্পে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে কক্সবাজার শহরের পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মঙ্গলবার ভোরে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। সেখানে একটি পাহাড়ের একাংশ ধসে একটি বসতবাড়ির ওপর পড়লে একই পরিবারের তিনজন মাটির নিচে চাপা পড়েন।

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এগিয়ে এসে মাটি সরিয়ে তিনজনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক আলী আকবর নামের একজনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকি দুজন বর্তমানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপের কারণে সমুদ্র বন্দরগুলোকে সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী আরও অন্তত দুই দিন জেলা জুড়ে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে গেছে, যার ফলে উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে থাকা বসতিগুলো চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের পাহাড়ধস এবং নিচু এলাকায় আকস্মিক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পাহাড়ধসে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। উখিয়া ও কক্সবাজার শহরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের চূড়ায় এবং পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, “টানা ভারী বর্ষণের কারণে উখিয়ার পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কা আরও বাড়ছে। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থানকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করছি এবং নির্দেশ দিচ্ছি। যারা স্বেচ্ছায় সরবেন না, তাদের প্রয়োজনে জোরপূর্বক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে। মানুষের জীবন বাঁচানোই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। উখিয়া এবং কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড় কেটে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন করার কারণেই এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। প্রশাসন যদি স্থায়ীভাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলো উচ্ছেদ না করে, তবে আগামী দিনগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews