
উজ্জ্বল মন্ডল, জেলা প্রতিনিধি (মাদারীপুর)
মাদারীপুরের শিবচরে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখে এক সফল ও ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গভীর রাতে পরিচালিত এই বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এক নারীসহ তিন মাদক কারবারিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। শুক্রবার (১৫ মে, ২০২৬) শিবচর উপজেলার ‘পূর্বকাকৈর বাটেরচর’ এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাইখা সুলতানা। অভিযানে মাদকদ্রব্য ও বিপুল পরিমাণ সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, শিবচরের পূর্বকাকৈর বাটেরচর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (১৪ মে, ২০২৬) দিবাগত গভীর রাতে অ্যাকশনে নামেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাইখা সুলতানা। তাঁর নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি চৌকস দল রাত আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী কালাম মাদবরের বাড়িতে ঘেরাও করে।
অভিযান চলাকালীন সময়ে কালাম মাদবরের বসত ঘরে তল্লাশি চালিয়ে হাতেনাতে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় সোহরাব উদ্দিন (৪০) নামে এক মাদক ক্রেতাকে আটক করে পুলিশ। তবে অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে মূল হোতা ও ধূর্ত মাদক বিক্রেতা কালাম মাদবর কৌশলে বাড়ি থেকে সটকে পড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু প্রশাসনের কঠোর বেষ্টনীর কারণে কালামের স্ত্রী ও পুত্র পালাতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ঘর তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ কালামের স্ত্রী সালমা বেগম (৪৫) ও তার পুত্র সাকিব আল হাসান (২৬) কে আটক করা হয়।
আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় শুক্রবার (১৫ মে) সকালে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা ঘোষণা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাইখা সুলতানা।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, মাদক বিক্রয় ও ঘরে মাদক রাখার অপরাধে মূল অপরাধী কালাম মাদবরের স্ত্রী সালমা বেগম (৪৫) এবং তার পুত্র সাকিব আল হাসান (২৬) কে ১ বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। অন্যদিকে, মাদক সেবন ও ক্রয়ের অপরাধে হাতেনাতে আটক হওয়া ক্রেতা সোহরাব উদ্দিন (৪০) কে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। সাজা ঘোষণার পর পরই দণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মাদারীপুর জেলা কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অভিযান ও সাজা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করে শিবচর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাইখা সুলতানা গণমাধ্যমকে জানান, “মাদক সমাজের এক মরণব্যাধি। এটি তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা শিবচর উপজেলাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। কালাম মাদবরের বাড়িতে পরিচালিত এই অভিযানটি আমাদের নিয়মিত মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অংশ।”
তিনি আরও সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, “মাদক কারবারি বা সেবনকারী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। পলাতক মাদক ব্যবসায়ী কালাম মাদবরকে আইনের আওতায় আনতেও পুলিশ তৎপর রয়েছে। মাদকের আখড়াগুলোর মূল উৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের এই কঠোর ও নিয়মিত অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে গভীর রাতে প্রশাসনের এমন আকস্মিক ও সফল অভিযানে পূর্বকাকৈর বাটেরচরসহ পুরো শিবচর উপজেলার সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, এই মাদক চক্রটির কারণে এলাকার উঠতি বয়সী যুবসমাজ বিপথগামী হচ্ছিল। কালাম মাদবরের বাড়িটি মূলত মাদক কেনাবেচার প্রধান নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছিল। প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপের কারণে এলাকা এখন অনেকটাই কলঙ্কমুক্ত হলো। সাধারণ মানুষ এই অভিযানের জন্য উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।