
সাহের আলী, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)
কুড়িগ্রামের সীমান্তঘেঁষা রৌমারী উপজেলায় মাদকের বিরুদ্ধে এক সফল অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই বিশেষ অভিযানে ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক বিক্রির বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ দুই চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) রাত আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে উপজেলার যাদুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের বারান্দা থেকে তাদের আটক করা হয়। প্রশাসনের এমন তৎপরতায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রৌমারী থানা পুলিশের একটি চৌকস দল দীর্ঘদিন ধরেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক নির্মূলে নজরদারি চালাচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার রাতে পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে যে, যাদুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কতিপয় মাদক কারবারি মাদক কেনাবেচা ও অর্থ লেনদেনের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই করে রৌমারী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করে।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করার সময় বিদ্যালয় ভবনের পশ্চিম পাশের বারান্দা থেকে দুইজনকে আটক করা হয়। পরে উপস্থিত স্থানীয় সাক্ষীদের সামনে তাদের দেহ তল্লাশি করে ৬ পিস নিষিদ্ধ ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক বিক্রির নগদ ৯ হাজার ১৯০ টাকা উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মাদক ও টাকা তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার হওয়া দুই মাদক কারবারি হলেন—
১. মোঃ রবিউল ইসলাম (৩০), পিতা: মৃত আইজুদ্দিন। তিনি রৌমারী উপজেলার ধনারচর নতুন গ্রামের বাসিন্দা।
২. মোঃ শাহজাহান মন্ডল (৩১), পিতা: মোঃ গাজিবর রহমান মন্ডল। তিনিও একই এলাকার বাসিন্দা।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এই সফল অভিযানের পর রৌমারী থানায় একটি নিয়মিত মাদক মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এই মামলাটি দায়ের করেন। রৌমারী থানা পুলিশ জানিয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বুধবার সকালে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। মাদকের উৎস এবং এর সাথে আর কারা জড়িত রয়েছে তা খতিয়ে দেখতে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
রৌমারী উপজেলার সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সীমান্তঘেঁষা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরণের মাদকের চোরাচালান ও ব্যবসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো মারাত্মক মাদকের প্রভাব উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে এবং এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাদক বিক্রির নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। যাদুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো একটি পবিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাতে মাদক কারবারিদের অবস্থান এর একটি বড় প্রমাণ। এই ঘটনার পর সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং রৌমারী উপজেলা থেকে মাদক সম্পূর্ণ নির্মূল করতে প্রশাসনের আরও কঠোর ও নিয়মিত ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন।
মাদক বিরোধী এই সফল অভিযানের বিষয়ে রৌমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাওসার আলী গণমাধ্যমকে বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। রৌমারী উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের এই বিশেষ ও সাঁড়াশি অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। মাদক চোরাচালান বা ব্যবসার সাথে জড়িত কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না, সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন।”
তিনি আরও বলেন, মাদকের এই মরণ ছোবল থেকে তরুণ ও যুব সমাজকে রক্ষা করতে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় অভিভাবক এবং সচেতন সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। যেকোনো স্থানে মাদকের তথ্য পাওয়া মাত্রই তা পুলিশকে জানানোর জন্য তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।