
ফিরোজ কবির, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা): গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় একটি পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া এই ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বেওয়ারিশ ও হিংস্র কুকুরের কামড়ে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
সর্বশেষ আজ বুধবার (১৩ মে) দুপুর ১২টার দিকে কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছালাম মিয়ার স্ত্রী মোছাঃ খোতেজা বেগম (৫৫) নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে একই এলাকায় জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও চারজন মারা গেছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সবাই কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। আজ মারা যাওয়া খোতেজা বেগম ছাড়াও ইতিপূর্বে যারা জলাতঙ্কের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা হলেন— আফরোজা বেগম, নন্দা রানী, ফুলু মিয়া এবং রতনেশ্বর কুমার।
এলাকাবাসী জানান, গত ২২ এপ্রিল (বুধবার) হঠাৎ করেই একটি বেওয়ারিশ পাগলা কুকুর লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং সামনে যাকে পায় তাকেই আক্রমণ করতে থাকে। চোখের পলকে কুকুরটি নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অন্তত ১৫ জনকে কামড়ে মারাত্মকভাবে জখম করে। কুকুরটির কামড় এতটাই হিংস্র ছিল যে, আক্রান্তদের শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিঁড়ে যায়।
আহতদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় হাসপাতাল ও বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার অভাব কিংবা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা সংশয় দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে পর্যায়ক্রমে আক্রান্তদের মধ্যে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে এবং একের পর এক পাঁচজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই পাগলা কুকুরের কামড়ে আহত আরও বেশ কয়েকজন বর্তমানে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। আক্রান্ত নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েকজন এখনও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আবার কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে কবিরাজি বা ওঝার মাধ্যমে অপচিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল মনে করছেন, আক্রান্তদের মধ্যে যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসার আওতায় আনা না হলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কুকুরের কামড়ের পর জলাতঙ্কের সঠিক চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন (Anti-Rabies Vaccine) যথাসময়ে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তাঘাট, হাটবাজার এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনেও কুকুরের দল ঘুরে বেড়ায়। বিশেষ করে রাতে বা ভোরে একা চলাচল করা সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি কুকুরের কামড়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫ জন মানুষ মারা গেল, অথচ প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে এখনো কোনো জোরালো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আমরা এখন সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছি। একা রাস্তায় বের হওয়া যাচ্ছে না। অতি দ্রুত এই বেওয়ারিশ কুকুর নিধন বা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হোক।”
জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। এলাকায় আতঙ্ক কমাতে এবং নতুন করে কেউ যেন আক্রান্ত না হয়, সেজন্য জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা এবং বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের মতে, কুকুরের কামড়ের পর অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়। কুকুর কামড়ানোর সাথে সাথে আক্রান্ত স্থানটি অন্তত ১৫-২০ মিনিট ক্ষারযুক্ত সাবান ও চলমান পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন (ARV) গ্রহণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কবিরাজি চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করা যাবে না, কারণ জলাতঙ্কের লক্ষণ একবার প্রকাশ পেলে রোগীকে বাঁচানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব এবং জলাতঙ্ক রোগের ভয়াবহতার চিত্রটি আবারও সামনে এনে দিল। স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন সরকারি সহায়তা এবং এলাকায় নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের অপেক্ষা করছে।