
অনলাইন জুয়া ও ইয়াবার থাবা কালিয়াকৈরে
অন্ধকার ভবিষ্যতে শিশু-কিশোরেরা, ঘরে ঘরে অশান্তি
মোঃ খাইরুল ইসলাম উপজেলা প্রতিনিধি শ্রীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ও পৌরসভার
প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় এখন এক নীরব অথচ মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি জেঁকে বসেছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে উঠতি বয়সী যুবক ও প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ বর্তমানে মোবাইল ফোনে তীব্র আসক্ত হয়ে পড়েছে। তবে এই আসক্তির পিঠ ধরে আরও এক ভয়ঙ্কর কালো থাবা গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মকে।
মোবাইলের ভার্চুয়াল আসক্তির সমান্তরালে কালিয়াকৈরের শিশু-কিশোররা ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে মরণনেশা ইয়াবার প্রতি। একদিকে মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক অনলাইন জুয়া, অন্যদিকে ইয়াবার নেশা-এই জোড়া মরণফাঁদে পড়ে উপজেলার শত শত পরিবার আজ সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত। মুহূর্তেই লাখপতি হওয়ার অলীক স্বপ্ন আর মাদকের নীল দংশনে বুঁদ হয়ে নতুন প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে পড়ছে এবং প্রতিটি ফ্যামিলিতে নেমে এসেছে চরম অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয় ও ঋণের বোঝা। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার গোয়ালবাথান, হরতকীতলা ভাতারিয়া চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর বাজার, বোর্ডঘর ও ফুলবাড়ীয়াসহ বিভিন্ন গ্রামীণ ও শিল্পাঞ্চল এলাকার অলিগলিতে মোবাইল জুয়া ও ইয়াবা কারবারিরা সক্রিয়। প্রথমে মোবাইল ফোনের গেম বা জুয়ায় রাত জাগা, এরপর সেই ক্লান্তি দূর করতে কিংবা বন্ধুদের প্ররোচনায় পড়ে কিশোরেরা হাতে তুলে নিচ্ছে ইয়াবা বড়ি। চায়ের দোকান, পরিত্যক্ত জায়গা বা ঘরের কোণে বসে দিন-রাত চলছে এই সর্বনাশা কারবার। জুয়া ও মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক কিশোর নিজের পরিবারের সঞ্চয় ও গহনা চুরি করছে, এমনকি ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও বিক্রি করে দিচ্ছে। কোনো কোনো পরিবার নিজেদের শেষ সম্বল জমি কিংবা ভিটেমাটি বন্ধক রেখে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জুয়ার দেনা শোধ করতে ও সন্তানের মাদকের খরচ জোগাতে বাধ্য হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। উপজেলার সফিপুর এলাকার এক ভুক্তভোগী মা অশ্রুসজল চোখে জানান, “আমার দশম শ্রেণীপড়ুয়া ছেলেটা সারাদিন মোবাইল নিয়ে ঘরের কোণে বসে থাকত। ভাবতাম পড়াশোনা বা গেম খেলছে। কিন্তু পরে জানতে পারলাম সে অনলাইনে জুয়া খেলে এবং বন্ধুদের সাথে মিশে ইয়াবা খাওয়া শুরু করেছে। ঘরের জমানো টাকা, আমার গলার চেইন সব চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন দেনার দায়ে আমরা এলাকা ছাড়ার অবস্থায় আছি। এই মোবাইল আর মাদক আমাদের পুরো পরিবারটাকে ধ্বংস করে দিলছে।” মৌচাক এলাকার একজন প্রবীণ স্কুল শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “পড়ালেখা তো অনেক দূরের কথা, মোবাইল আসক্তি আর
ইয়াবার কারণে আমাদের এলাকার ছেলেদের চোখের জ্যোতি কমে যাচ্ছে, কিশোর বয়সে তাদের আচরণ উগ্র ও খিটটে হয়ে উঠছে। এরা মাঠে খেলতে যায় না, সমাজ চেনে না। এখনই যদি পাড়ায়-মহল্লায় এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে আমাদের এই পুরো প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।”
অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং ইয়াবা সেবনের মারাত্মক যৌথ স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকেরা। কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া তাসনিম বলেন দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখায় কম বয়সীদের চোখের জ্যোতি মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। এর সাথে ইয়াবার প্রভাবে দেখা দিচ্ছে তীব্র মানসিক বিকৃতি, খিটটে মেজাজ, অনিদ্রা এবং চরম আগ্রাসী আচরণ। পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়ে কিশোরেরা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো মারাত্মক অপরাধে, যা কালিয়াকৈরের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এলাকায় অনলাইন জুয়া ও ইয়াবার এই যৌথ ভয়াবহতা নজরে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। অপরাধ দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখে গাজীপুর জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নির্বাচিত হওয়া কালিয়াকৈর থানার ওসি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, “পরিবেশ ও সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাদকাসক্তি ও ডিজিটাল অপরাধ। এসব মরণনেশায় জড়িয়ে পড়লে কেবল একটি শিশু নয়, বরং পুরো পরিবার দীর্ঘমেয়াদি চরম নেতিবাচক প্রভাব ও ধ্বংসের মুখে পড়ে। কালিয়াকৈরকে অপরাধ, মাদক ও অনলাইন জুয়ামুক্ত করতে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে মাঠে নেমেছে এবং ডিজিটাল অপরাধী ও মাদক সিন্ডিকেটের মূল
হোতাদের ধরতে এই বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
কেবল পুলিশ বা প্রশাসনের অভিযানের ওপর নির্ভর করে এই সর্বনাশা আসক্তি ও মাদকের বিস্তার বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, সমাজকে ভেতর থেকে বদলাতে কালিয়াকৈরে অবিলম্বে ৫টি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. সচেতন নাগরিক কমিটি গঠন: কালিয়াকৈরের প্রতিটি ওয়ার্ড ও মহল্লায় স্থানীয় শিক্ষক, ইমাম, অভিভাবক ও তরুণদের নিয়ে ‘মাদক ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
২. খেলার মাঠ উদ্ধার ও বিকল্প বিনোদন: শিশুদের স্মার্টফোন ও মাদকের আড্ডা থেকে দূরে রাখতে বিকেলে ফুটবল, ক্রিকেট ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মাঠের খেলার আয়োজন নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. কঠোর পারিবারিক নজরদারি: মা-বাবাকে সন্তানের ডিজিটাল কার্যকলাপ ও কার সাথে মিশছে, সেদিকে কঠোর নজর রাখতে হবে। কোনোভাবেই স্কুলপড়ুয়াদের ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ও অতিরিক্ত হাতখরচ দেওয়া যাবে না।
৪. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার: স্থানীয় মসজিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত অনলাইন জুয়া ও ইয়াবার ভয়াবহতা এবং পারিবারিক অবক্ষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
৫. অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট:
অনলাইন জুয়ার চক্র ও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় এজেন্ট বা জুয়াড়িদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং তাদের তথ্য প্রশাসনকে জানাতে হবে। কালিয়াকৈরের সচেতন মহলের মতে, এখনই যদি সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা না হয়, তবে এই মোবাইল জুয়া, আসক্তি ও ইয়াবার নীল দংশন উপজেলার পুরো প্রজন্মকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।