
সিংগাইর পৌরসভার সড়ক যেন মরণফাঁদ
খানাখন্দে বেহাল সড়ক, চরম জনদুর্ভোগ; শিক্ষার্থী-রোগী ও কৃষিপণ্য পরিবহনে ভোগান্তি
সাইফুর রহমান, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ):
মানিকগঞ্জের সিংগাইর পৌরসভার অধিকাংশ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে। পিচ ও ইট-সুরকি উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় যানবাহন চলাচল যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, তেমনি পথচারীদেরও প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে পৌরবাসীর জনদুর্ভোগ এখন চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, যথাযথ তদারকির অভাব এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় কয়েক বছরের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে এসব সড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
গতকাল বুধবার সরেজমিনে সিংগাইর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের যাতায়াতের জন্য নির্মিত একাধিক পাকা সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও সড়কের ইট-বালু বের হয়ে গেছে, আবার কোথাও রাস্তার বিভিন্ন অংশ ভেঙে গিয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর মধ্যে হেলিপ্যাড থেকে উকিল জাহিদের বাড়ি, ঘোনা পাড়া ফায়ার সার্ভিস অফিস থেকে হাসপাতাল গেট, কাশিমনগর নদীর পাড় থেকে পানির পাম্প, জিজি মডেল হাইস্কুলের উত্তর পাশ থেকে বৌরাগীর আখড়া, কাশেনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক, রংয়ের বাজার থেকে দশানী সংযোগ সড়ক এবং পৌরসভা থেকে সাইদুর নেতার বাড়ি পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক ভাঙন ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি
বেহাল সড়কের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন এসব সড়ক দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে গিয়ে তাদের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। বৃষ্টির সময় খানাখন্দে পানি জমে গেলে গর্ত বোঝার উপায় থাকে না। এতে শিক্ষার্থীদের সাইকেল ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক সময় যানবাহন ধীরগতিতে চলায় শিক্ষার্থীদের সময়মতো বিদ্যালয় ও কলেজে পৌঁছাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
রোগী পরিবহনেও চরম দুর্ভোগ
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্কদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় খানাখন্দে অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহন ঝাঁকুনি খাচ্ছে। এতে রোগীর শারীরিক কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে। জরুরি রোগী হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সময় বেশি লাগছে বলে স্থানীয়রা জানান।
কৃষিপণ্য পরিবহনেও বাধা
সিংগাইরের কৃষকরা উৎপাদিত ধান, সবজি, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার সময়ও সমস্যায় পড়ছেন। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে পণ্যবাহী ভ্যান, অটোরিকশা, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে। এতে সময় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ যানজটে বা সড়কের গর্তে আটকে থেকে কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। ফলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকেও কৃষকরা বঞ্চিত হতে পারেন বলে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ।
এছাড়া ইট, বালু, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী বোঝাই ভারী যানবাহন নিয়মিত চলাচল করায় সড়কগুলোর ক্ষয় আরও বাড়ছে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সংস্কারের পাশাপাশি ভারী যানবাহন চলাচলের বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সড়কগুলোর সংস্কার ও মেরামতের উদ্যোগ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এতে ঝরতে পারে তাজা প্রাণ। অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার দু-একটি সড়কের জন্য প্রকল্প নেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই ধীরগতির।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস আলী বলেন, “পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রের অনেক রাস্তা ভাঙাচোরা। কোথাও আবার সড়কের পাশের লাইটও নষ্ট হয়ে আছে। খানাখন্দের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। দ্রুত এসব সড়ক সংস্কার করা প্রয়োজন।”
হ্যালোবাইক চালক মফেজ উদ্দিন বলেন, “রাস্তা ভাঙাচোরা হওয়ায় যাত্রী কমে গেছে। গাড়ির যন্ত্রাংশও বারবার নষ্ট হয়। আয় যা করি, তার বড় একটি অংশ গাড়ির যন্ত্রাংশ মেরামতেই চলে যায়। এই সড়ক দিয়েই হাসপাতাল, হাট-বাজার ও অফিস-আদালতে মানুষ যাতায়াত করে। কিন্তু রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে সিংগাইর পৌরসভার প্রশাসক খায়রুন নাহার বলেন, “ইতোমধ্যে কিছু রাস্তার সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। বাকি সড়কগুলোও জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে খানাখন্দ ভরাট না করে টেকসইভাবে সড়ক সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি এবং যথাযথ মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।