
মোঃ আলমগীর হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি (ঢাকা)
পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোমগ্রাম পশুর হাটে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে এক জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ধামরাই উপজেলার ৪ নং যাদবপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পশুর হাটটিতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কোরবানির পশু কেনার জন্য এই হাটে ছুটে আসছেন। বৈরী আবহাওয়া ও দফায় দফায় প্রবল ঝড়-বৃষ্টির পরেও হাটের কেনাবেচায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, বরং ক্রেতা-বিক্রেতাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় হাট প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে গোমগ্রাম পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই হাটে পশুর আমদানি হতে শুরু করে। দুপুরের পর থেকে ক্রেতাদের সমাগম আরও বৃদ্ধি পায়। বিকেলে হঠাৎ করে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলেও ক্রেতা কিংবা বিক্রেতা—কেউই মাঠ ছেড়ে যাননি। ছাতা মাথায় দিয়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজেই ক্রেতারা তাদের পছন্দের পশুটি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পশু কোরবানি দেওয়ার এই পবিত্র নিয়ত ও ধর্মীয় আবেগ এতটাই প্রবল যে, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগই তাদের এই আনন্দ ও প্রস্তুতিকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
হাটে আসা এক ক্রেতা বলেন, ঝড়-বৃষ্টি তো আল্লাহর নেয়ামত। কোরবানির পশু কেনা আমাদের জন্য একটি আনন্দের ইবাদত। একটু কষ্ট হলেও গোমগ্রাম হাট থেকে সাধ্যের মধ্যে একটি সুন্দর ও সুস্থ গরু কিনতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই হাটের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। স্থানীয় বাসিন্দা ও হাটের নিয়মিত ক্রেতাদের মতে, ধামরাই উপজেলার প্রায় ৮ থেকে ১০টি উল্লেখযোগ্য পশুর হাটের মধ্যে গোমগ্রাম পশুর হাটটি কেনাকাটার জন্য অন্যতম সেরা ও নিরাপদ। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এখানকার সুশৃঙ্খল পরিবেশ, বিশাল জায়গা, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং হাটের সার্বিক নিরাপত্তা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যাপারীরা এখানে নিরাপদে তাদের পশু রাখতে পারেন, আর ক্রেতারাও কোনো ধরনের দালালের খপ্পরে না পড়ে সরাসরি খামারি বা বিক্রেতার কাছ থেকে পশু ক্রয় করতে পারেন।
হাটে গরুর আমদানি যেমন প্রচুর, তেমনি ছাগল ও ভেড়ার উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর চাহিদা এবার সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। তবে হাটের মূল আকর্ষণ ছিল বিশাল আকৃতির কিছু দেশি ষাঁড়, যা দেখতে হাটের মানুষ ভিড় জমায়। বিক্রেতারা জানান, গোমগ্রাম হাটে পশুর ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় বলে তারা প্রতি বছর এখানেই পশু নিয়ে আসেন।
মানিকগঞ্জ থেকে আসা এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, “আমি এবার ১০টি গরু নিয়ে গোমগ্রাম হাটে এসেছি। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কিছুটা সমস্যা হলেও দুপুরের পর থেকে ভালোই বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা দামদর করে গরু কিনছেন। এখানকার হাট ইজারাদার এবং স্থানীয় ভলান্টিয়ারদের ব্যবহার ও সহযোগিতা খুবই ভালো।”
অন্যদিকে, ধামরাই সদরের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম জানান, “আমি গত কয়েক বছর ধরেই এই গোমগ্রাম হাট থেকে কোরবানির পশু কিনি। ধামরাইয়ের অন্যান্য ৮-১০টি হাটের চেয়ে এই হাটের বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে পশুর দাম তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং কোনো ধরনের অতিরিক্ত হাসিল বা জোরজুলুমের শিকার হতে হয় না। আজ বৃষ্টির মাঝেও হাটে এসে চমৎকার একটি দেশি গরু কিনতে পেরেছি, যার কারণে মনে খুব শান্তি পাচ্ছি।”
ঐতিহ্যবাহী গোমগ্রাম পশুর হাট সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪ নং যাদবপুর ইউনিয়ন পরিষদ ও হাট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। হাটের জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ স্থাপন করা হয়েছে, যাতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতারিত না হন। এছাড়া পর্যাপ্ত লাইটিং, মলিণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দূরবর্তী ক্রেতাদের জন্য খাবারের সুব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
যাদবপুর ইউনিয়নের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গোমগ্রাম পশুর হাট এই অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যের প্রতীক। মানুষের কোরবানি যেন সুন্দর ও নির্বিঘ্ন হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় যুবসমাজ ও সেচ্ছাসেবীরা হাটে চোর-উচ্ছৃঙ্খলতা রোধে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন। ঝড়-বৃষ্টির এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ক্রেতারা যেভাবে হাসিমুখে পশু কিনে বাড়ি ফিরছেন, তা সত্যিই আনন্দদায়ক।সব মিলিয়ে, বৈরী আবহাওয়াকে জয় করে ধামরাইয়ের ৪ নং যাদবপুর ইউনিয়নের গোমগ্রাম পশুর হাট এখন উৎসবের আমেজে মাতোয়ারা। ধর্মীয় অনুভূতি ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে মানুষ যেভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু ক্রয় করছেন, তা এই হাটের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।