
মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, ঢাকা জেলা প্রতিনিধি
দেশব্যাপী মাদকের ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং মাদক সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলতে বড় ধরনের অ্যাকশনে নেমেছে বাংলাদেশ পুলিশ। দেশব্যাপী মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের অংশ হিসেবে গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযানে এক মাসেই উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, এই ১ মাসের বিশেষ অভিযানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোটি কোটি টাকা বাজারমূল্যের ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, দেশি-বিদেশি মদ এবং গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সাথে গ্রেফতার করা হয়েছে হাজারো চিহ্নিত মাদক কারবারিকে, যার ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমান সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মাদকের এই বিশাল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে গত ১ মে থেকে দেশব্যাপী একযোগে বিশেষ অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন পুলিশের আইজিপি। দেশের প্রতিটি জেলা, থানা, হাইওয়ে পুলিশ এবং বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এই নির্দেশনার আলোকে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি কোণায় অপরাধীদের আস্তানায় হানা দিয়ে এই অভূতপূর্ব সাফল্য নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশ।
বাংলাদেশ পুলিশের হেডকোয়ার্টার্স থেকে সংগৃহীত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের অভিযানের গভীরতা ও কার্যকারিতা পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ১ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত পরিচালিত দেশব্যাপী অভিযানে উদ্ধারকৃত মাদকের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
ইয়াবা ট্যাবলেট: মাদক কারবারিদের সবচেয়ে বড় চাটুকারিতা ও চাহিদাসম্পন্ন মাদক ইয়াবার ওপর পুলিশ সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে। এক মাসে মোট ৩৬ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮৩ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে, যার বড় একটি অংশ দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে রাজধানীসহ বিভিন্ন বড় শহরে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল।
হেরোইন: অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ৭২৬ দশমিক ২১ গ্রাম (প্রায় ৪.৭ কেজি) মারাত্মক ক্ষতিকারক মাদক হেরোইন।
ফেনসিডিল: বিভিন্ন সীমান্ত রুট ব্যবহার করে দেশে আসা ১ হাজার ৮৬৩ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করতে সক্ষম হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।
বিদেশি মদ: উচ্চবিত্ত ও অভিজাত এলাকায় সরবরাহের জন্য আনা ৩ হাজার ৭৪৮ বোতল নামী-দামী ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশি মদ: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধভাবে উৎপাদিত এবং চোলাইকৃত ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৯ দশমিক ৫২ লিটার দেশি মদ ধ্বংস ও জব্দ করা হয়েছে।
গাঁজা: দেশের বিভিন্ন গোপন আস্তানা ও আবাদি জমি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিশাল ওজনের মাদকের স্তূপ, যার পরিমাণ ৫ হাজার ৮২০ দশমিক ১৮ কেজি (প্রায় ৫.৮ টন) গাঁজা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, উদ্ধারকৃত মাদকের এই বিশাল পরিমাণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানের ব্যাপকতা ও কার্যকারিতার বাস্তব প্রতিফলন। পুলিশের এই ধারাবাহিক ও অতর্কিত তৎপরতার ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বড় বড় মাদক সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে। মাদক পাচার, বিক্রয় ও সেবনের সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে শনাক্ত করে সুনির্দিষ্ট মামলার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশের এই কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে, যা মাদক নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কেবল আইনি পদক্ষেপ বা পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে সমাজ থেকে মাদক সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ পুলিশ দেশের সর্বস্তরের জনগণকে এই মাদকবিরোধী মহৎ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করার জোরালো আহবান জানিয়েছে। আপনার আশেপাশে যদি কোনো সন্দেহভাজন মাদক কারবার, মাদকের অবৈধ আস্তানা, মজুদ বা পাচারের তথ্য থাকে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ থানা পুলিশকে অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। তথ্যদাতার নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
সামাজিক সচেতনতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা ধরে রাখতে পারলে আগামী দিনে বাংলাদেশকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট সমাজচিন্তক ও সচেতন নাগরিক সমাজ।