
আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র তথা ‘গাজীপুরের মিনি কক্সবাজার’
মোঃ খাইরুল ইসলাম শ্রীপুর প্রতিনিধি গাজীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী মকশ বিল আজ চরম অবহেলা আর দখলের কবলে পড়েছে। অথচ এই বিলটিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হলে তা হতে পারে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র তথা ‘গাজীপুরের মিনি কক্সবাজার’। বিস্তীর্ণ জলরাশি, কাশফুল, অতিথি পাখি আর গ্রামীণ জীবনের অপার সৌন্দর্য এখানে ইকো-ট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় অধিবাসী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তবে কার্যকর সংরক্ষণের অভাবে সেই স্বপ্ন এখন ট্রাজেডিতে রূপ নিতে বসেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে মকশ বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি ও মনোরম নৌভ্রমণের সুযোগ যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে। শরৎকালে বিলের দুই ধারে ফোটা সাদা কাশফুল, শীতকালে সাইবেরিয়া থেকে আসা অতিথি পাখির কলকাকলি এবং বিলসংলগ্ন গ্রামীণ জনজীবন এখানকার বাড়তি আকর্ষণ।
স্থানীয় প্রবীণ জেলে কামাল হোসেন হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ছোটবেলায় দেখতাম বিলের পানি কাঁচের মতো স্বচ্ছ ছিল। এখন চারদিক থেকে ময়লা ফেলা হচ্ছে, জমি ভরাট হচ্ছে। আগের মতো আর পাখিও আসে না।
স্থানীয়দের মতে, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাখির বিচরণ, নৌভ্রমণ ও গ্রামীণ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সঙ্গে পর্যটনকে যুক্ত করার সুযোগও তৈরি করা সম্ভব।
বর্তমানে বিলের চারপাশে প্রভাবশালী মহল মাটি ভরাট করে অবৈধ দখল মেতে উঠেছে। কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ফেলা হচ্ছে বিলের পানিতে। এর ওপর শীতকালে অতিথি পাখি আসামাত্রই অসাধু শিকারিরা ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করছে। ফলে দিন দিন বিলের গভীরতা কমছে, হ্রাস পাচ্ছে দেশীয় মাছের উৎপাদন এবং মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে সার্বিক জীববৈচিত্র্য।
চান্দরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনন্দ কুমার দাস বলেন, মকশ বিল কেবল একটি সাধারণ জলাভূমি নয়, এটি কালিয়াকৈরের প্রাকৃতিক ফুসফুস ও পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অমূল্য স্তম্ভ। যান্ত্রিক শহরের কোলঘেঁষে থাকা এই বিলকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। তবে উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই যেন এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইকোসিস্টেম নষ্ট না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, মকশ বিলকে কৃত্রিম কোনো বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর না করে পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এর মূল প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বিলের সীমানা নির্ধারণ, সুনির্দিষ্ট নৌঘাট নির্মাণ, নিরাপদ নৌভ্রমণ নিশ্চিতকরণ, বসার স্থান, বিশুদ্ধ খাবার পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও নামাজের স্থান তৈরি করা। এছাড়া বিলের নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘নীরব অঞ্চল’ ঘোষণা করা, পাখি শিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করা, দেশীয় জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জেলে, নৌকার মাঝি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যটন সেবায় যুক্ত করার ওপর জোর দেন তাঁরা।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ. এইচ. এম ফখরুল হোসাইন ইনকিলাবকে বলেন, মকশ বিলকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা উপজেলা প্রশাসনের রয়েছে। পাশাপাশি মকশ বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। স্থায়ী পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের আগে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়ক ও সেতুর সংস্কার, দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড স্থাপন এবং জরুরি চিকিৎসা ও উদ্ধার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, মকশ বিল কালিয়াকৈরের অমূল্য সম্পদ এবং সমগ্র গাজীপুরের গর্ব। এটিকে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না। আমি জাতীয় সংসদে এই বিলকে ‘ইকো-ট্যুরিজম পার্ক’ হিসেবে ঘোষণার জোর দাবি জানাব। যারা অবৈধভাবে বিল দখল ও ভরাট করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। মকশ বিল হবে গাজীপুরের মিনি কক্সবাজার, যেখানে দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক আসবেন-এটি আমার অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার।
এদিকে কালিয়াকৈর পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী দেওয়ান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, মকশ বিলকে ঘিরে আমার একটি বিশাল ভিশন রয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে আমি প্রথমেই এই বিলকে সম্পূর্ণ দখল ও দূষণমুক্ত করব। এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য আধুনিক ওয়াচ টাওয়ার, ফুড কোর্ট, স্থানীয় পিঠা ও হস্তশিল্পের বাজার এবং নিরাপদ নৌ-ভ্রমণ চালু করব। এই বিলই হবে কালিয়াকৈরের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি, যেখানে হাজারো যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কোনো দখলদারকে একচুল ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহনকারী এই প্রাকৃতিক জলাভূমিকে অব্যবস্থাপনা ও দখল-দূষণের হাত থেকে রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা বলছেন, মকশ বিলকে ঘিরে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার, পিঠা, হস্তশিল্প ও কৃষিপণ্যের হাট বসানোর পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় জনগণকে সরাসরি অংশীদার করে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে একটি বাস্তবসম্মত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে মকশ বিল গাজীপুরের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে। এতে একদিকে যেমন বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে স্থানীয় যুবসমাজের বিশাল কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
তবে এখনই প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ না থাকলে গাজীপুরের ‘কক্সবাজার’ খ্যাত ঐতিহাসিক এই মকশ বিলটি অচিরেই এক বিষাক্ত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ মহল।