স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল
৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, বরিশালের কাউনিয়া থানার আওতাধীন পলাশপুর এলাকায় ‘কালা বাবু’ নামে এক স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্রুত নিজের এক ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন। তিনি বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মশিউর রহমান মঞ্জু এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতা হানিফ হাওলাদারের ‘ডান হাত’ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। বাবুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত ‘প্রোটেকশন মানি’ (নিরাপত্তা বা সুরক্ষা বাবদ অর্থ) আদায়, অবৈধ ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং সালিশ-মীমাংসার নামে সাধারণ মানুষের জমি ও অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
আসল নাম কালা বাবু (যিনি ‘ভাই আপন চৌধুরী বাবু’ নামেও পরিচিত)—এই ব্যক্তি আওয়ামী লীগ আমলেও পলাশপুর এলাকায় কাউন্সিলর রনির সাথে মিলে বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে লিপ্ত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি মশিউর রহমান মঞ্জুর ডান হাত হয়ে ওঠেন। স্থানীয় দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং মঞ্জুর স্বেচ্ছাসেবক দলের সমাবেশে তাদের বিশাল উপস্থিতি নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করেই তিনি মূলত এই অবস্থানটি তৈরি করেছেন। বাবু নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য সুবিধাবঞ্চিত ও স্বল্পশিক্ষিত তরুণদের ব্যবহার করেন। তিনি ওই এলাকায় ড্রেজিং ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক জমি দখল, সালিশ-মীমাংসার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা (যেমন বিয়ে-শাদীর বিষয়ে হস্তক্ষেপ) এবং চড়া সুদে ঋণ দেওয়ার (সুদ-কারবার) মাধ্যমে নিজের আধিপত্য কায়েম করেছেন। পলাশপুর-মোহাম্মদপুর ব্রিজের কাছে একটি ছোট টিনশেড ক্লাবকে তিনি আড্ডা ও সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করেন; সেখানে প্রতিদিন রাত ৯টার পর সালিশ-মীমাংসার নামে তিনি অর্থ উপার্জনের এক লাভজনক কারবার চালান। এছাড়া, মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত স্থানীয় এক নারী শিল্পী ও তাঁর স্বামী মান্নার কাছ থেকেও তিনি নিয়মিত ‘প্রোটেকশন মানি’ আদায় করেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কালা বাবু একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছেন। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, বাবু স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এবং প্রভাবশালী মহানগর বিএনপি নেতা মনিরুজ্জামান খান ফারুকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাশিউর রহমান মঞ্জুর ‘আশীর্বাদ’পুষ্ট। মঞ্জুকে ‘বড় ভাই’ ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ব্যবহার করে বাবু এলাকায় একের পর এক অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর কালা বাবু পলাশপুর এলাকায় একটি ছোট ক্লাবঘর তৈরি করেন, যা এখন তাঁর প্রধান কার্যালয় বা ‘হেডকোয়ার্টার’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে প্রতি রাতে তথাকথিত ‘সালিশ-দরবার’ বসে। এই সালিশের আড়ালে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং জোরপূর্বক জমির মালিকানার দলিল হাতিয়ে নিয়ে তিনি লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কেউ তাঁর অবাধ্য হলে বা টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়াও, স্থানীয় অবৈধ বালু উত্তোলনের ব্যবসা এখন পুরোপুরি কালা বাবুর নিয়ন্ত্রণে। তিনি স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের ‘প্রোটেকশন মানি’ বা নিরাপত্তা-চাঁদা আদায় করেন। নিজের প্রভাব বজায় রাখতে তিনি অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের তরুণদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে মঞ্জুর আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে নিয়ে যান। ফলে স্থানীয়রা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
বরিশালবাসী ইতিমধ্যে ৫ আগস্ট বরিশাল মহানগর বিএনপিতে হামলার মূল হোতা কেফায়েত হোসেন রনির ছবি ও ভিডিও দেখেছেন; মনিরুজ্জামান ফারুক, মাশিউর রহমান মঞ্জু এবং কালা বাবু এলাকায় রনির উপস্থিতিকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে উচ্চতর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা দল ও নেতাদের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও জমি দখলের মতো অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছেন। মনিরুজ্জামান ফারুক, মশিউর রহমান মঞ্জু এবং কালা বাবু বরিশাল মহানগর বিএনপিতে আগস্ট মাসে চালানো হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কেফায়েত হোসেন রনিকে—এলাকায় অবস্থান করতে সহায়তা করছেন; রনির ছবি ইতিমধ্যে নগরবাসী দেখেছে।