নিজস্ব প্রতিবেদন
গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়নে সরকারি রাস্তা কেটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের ড্রেন নির্মাণের ঘটনায় এবার আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—সরকারি রাস্তা কাটার অনুমতি না থাকলে কার প্রভাবে, কীভাবে এবং কোন কর্তৃপক্ষের নীরবতায় দিনের পর দিন রাস্তা কেটে রাখা হলো?
প্রথম পর্বের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাঘের বাজার থেকে গাজীপুর সাফারি পার্কমুখী কার্পেটিং সড়কসহ অন্তত তিনটি সড়ক ড্রেন নির্মাণের জন্য কাটা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ড্রেনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের বসতবাড়ির বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, অনুমোদন ছাড়াই সরকারি সড়ক কাটার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।
অনুমোদন ছিল না—তবুও রাস্তা কাটা হলো কীভাবে?সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু বকর ছিদ্দিক নিজেই স্বীকার করেছেন যে রাস্তা কাটার আগে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। তাঁর দাবি, এলাকার মানুষের স্বার্থেই রাস্তা কাটা হয়েছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—জনস্বার্থে হলেও সরকারি রাস্তা কাটার ক্ষেত্রে কি আইন ও অনুমোদনের প্রয়োজন নেই?
এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে রাস্তা কাটার ঘটনা ঘটলেও পরবর্তীতে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা তখন কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—তদন্ত হবে কি?
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, রাস্তা কাটা ও ড্রেন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক অর্থ লেনদেন হয়েছে। এমনকি আশপাশের বাড়িঘরে ড্রেন সংযোগ দেওয়ার নামে বাড়িপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবু বকর ছিদ্দিক। ফলে এখন মূল প্রশ্ন—অভিযোগ সত্য, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?
এর উত্তর বের করতে প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত। রাস্তা কাটার অনুমোদন, ড্রেন নির্মাণের ব্যয়, অর্থের উৎস, কারা অর্থ দিয়েছে এবং কারা গ্রহণ করেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এলজিইডির কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাস্তা কাটার সময় এলজিইডির কর্মকর্তারা বিষয়টি অবগত ছিলেন। এমনকি একজন নির্বাহী প্রকৌশলী সরেজমিনে এসেছিলেন বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এলজিইডির কর্মকর্তা হেলাল দাবি করেছেন, রাস্তা কাটার সময় তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীকে বারবার ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে তাঁর পক্ষে এককভাবে কী করার ছিল—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার যে অভিযোগ স্থানীয় সূত্রে উঠেছে, সেটি অত্যন্ত গুরুতর। এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তও জরুরি।
ঠিকাদারের ভূমিকাতেও রহস্য যে সড়কের উন্নয়ন প্রকল্প চলমান ছিল, সেই সড়কেও ড্রেন নির্মাণের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। ঠিকাদার বাঁধন জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি এলজিইডিতে অভিযোগ করেছেন।
তবে অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে—রাস্তা কাটার ঘটনা যদি আগে থেকেই ঘটে থাকে, তাহলে এতদিন পর কেন বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করা হলো? আর প্রকল্প চলমান থাকা অবস্থায় সরকারি সড়ক কাটা হলো কীভাবে? এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর না মিললে ঘটনাটির পেছনে কার স্বার্থ কাজ করেছে তা নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হবে।
ভুক্তভোগী হাজার হাজার মানুষ এদিকে রাস্তা কাটার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও পোশাকশ্রমিকরা। সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনের ময়লা ও বর্জ্য পানি রাস্তায় উঠে আসছে। তৈরি হচ্ছে দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। খানাখন্দে ভরা সড়কে প্রতিদিন দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করছেন শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশু।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সুবিধার জন্য যদি হাজার হাজার মানুষের চলাচলের পথ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে কীভাবে জনস্বার্থ বলা যায়?রাজনৈতিক পরিচয় কি সরকারি আইন থেকে ঊর্ধ্বে?স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তাদের ভাষ্য, অতীতে যে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলেছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতায় একই ধরনের অভিযোগ উঠলে সেটিও কঠোরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো দলের একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যেন পুরো দলের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে—এ জন্য দলীয় হাইকমান্ডেরও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
এখন সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
১. অনুমোদন ছাড়া সরকারি রাস্তা কাটার অনুমতি কে দিল?
২. রাস্তা কাটার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে থেকেও কেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেন না?
৩. ড্রেন নির্মাণের অর্থের উৎস কী?
৪. বাড়িপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু?
৫. কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই ড্রেন থেকে সরাসরি সুবিধা পেয়েছে কি না?
৬. রাস্তা কাটার ক্ষতিপূরণ ও পুনঃসংস্কারের দায় কার?
৭. এলজিইডির কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না?
৮. অভিযোগে অর্থ লেনদেনের যে বিষয়টি এসেছে, সেটি তদন্ত করা হবে কি?
প্রশাসনের কাছে দাবি ভুক্তভোগীদের দাবি, বিষয়টি আর শুধু রাস্তা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাস্তা কাটার অনুমোদন, ড্রেন নির্মাণ, অর্থ লেনদেন, সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।
এলজিইডির জেলা প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানিয়েছেন, রাস্তা কাটার বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন দেখার বিষয়—এই ‘পরবর্তী ব্যবস্থা’ কি শুধু নোটিশেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই বেরিয়ে আসবে সরকারি রাস্তা কাটার নেপথ্যের পুরো ঘটনা?