মোঃ মাজহারুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
কাঁচি নেই, চিরুনি নেই, নেই কোনো আধুনিক সরঞ্জাম। ডান হাতে একটি ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেই মানুষের চুল কেটে দেন আবেদ তেলি। বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। এভাবেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের অসচ্ছল মানুষের চুল কেটে দিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর ব্যতিক্রমী পদ্ধতিতে চুল কাটার দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন অনেকে।
রনজিতেশ্বর গ্রামের আবেদ তেলি নিজেও অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। জীবিকা নির্বাহের জন্য রয়েছে ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলদ গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজের আয়েই চলে তাঁর সংসার। নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় ও শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
আবেদ তেলির চুল কাটার পদ্ধতিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কাঁচি, ক্ষুর কিংবা চিরুনি ছাড়াই শুধু একটি ব্লেড দিয়ে তিনি চুল কাটেন। ডান হাতে ব্লেড চালানোর সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই কাজটি তিনি নিখুঁতভাবে রপ্ত করেছেন।
আবেদ তেলি জানান, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কাটেন তিনি। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত চুল কাটাতে পারেন না, তাদের অনেকেই তাঁর কাছে আসেন। কেউ নিজের পছন্দের ধরন বলে দিলে সেভাবেই চুল কেটে দেন তিনি।
নিজের এই কাজের শুরুর গল্প বলতে গিয়ে আবেদ তেলি বলেন, “এক ছেলে স্কুলে গেছিল। তার শিক্ষক চুল ধরে টান দিয়েছিলেন। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল। জিজ্ঞেস করলাম—কাঁদিস কেন? সে বলল, স্যার চুল ধরে টেনেছেন। বললাম—চুল কেটে নিচ্ছিস না কেন? বলল—আমার টাকা নেই, বাবারও টাকা নেই। সেদিনই একটি ব্লেড এনে তার চুল কেটে দিতে শুরু করি। সেই যে শুরু, আজও থামেনি।
এরপর থেকে আর থেমে থাকেননি আবেদ। গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে সময়মতো চুল কাটাতে পারেন না। তাদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন নির্ভরতার প্রতীক। শুধু চুল কাটাই নয়, মানুষকে পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও সচেতন করেন তিনি। কারও মাথায় বড় ও অপরিচ্ছন্ন চুল দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার পরামর্শ দেন। সময়মতো নখ কাটা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন।
কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে কেন এত সময় ও শ্রম দেন—জানতে চাইলে আবেদ তেলি বলেন, “অপরিষ্কার মানুষ দেখতে ভালো লাগে না। অপরিচ্ছন্ন, ঝাঁকড়া-বাঁকড়া চুল দেখতে খারাপ লাগে। মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার মন ভালো হয়ে যায়। আবেদের কাছে নিয়মিত চুল কাটান আহসান হাবীব হাসান। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই কোনো টাকা ছাড়া আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই।
https://youtu.be/DtGvPNI-K2Y?si=CUBs0aYiAZdMMr5k
শাহ আলম সরকার বলেন, টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে উনিই আমার শেষ ভরসা। স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন, “অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজে এমন উদ্যোগকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
কুড়িগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন বলেন, “নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের এই অনন্য উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও হাসিমুখকে প্রাধান্য দিয়ে প্রায় ৩৫ বছর ধরে একটি ব্লেড হাতে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আবেদ তেলি। কোনো পারিশ্রমিকের প্রত্যাশা না রেখেই করে যাচ্ছেন এই কাজ। রাজারহাটের নিভৃত গ্রামের এই মানুষটি তাই শুধু একজন চুল কাটার কারিগর নন; অসচ্ছল মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন নিঃস্বার্থ সহযোগিতার এক অনন্য উদাহরণ