মোহাম্মদ রায়হান ইসলাম, উপজেলা প্রতিনিধি (টেকনাফ)
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে কক্সবাজার জেলা জুড়ে চলছে রেকর্ড ভাঙা ভারী বর্ষণ। এই অবিরাম বৃষ্টিপাতে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের ওয়াব্রাং গ্রামটি সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) সকাল থেকে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টিতে গ্রামের প্রধান সড়ক, কাঁচা রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি এবং আঙিনা ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে আকস্মিক এই বন্যায় গ্রামের শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে পাহাড়ি ঢলের পানি ওয়াব্রাং গ্রামে প্রবেশ করতে শুরু করে। দুপুরের মধ্যেই পুরো গ্রাম এক প্রকার বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেতে পারছে না। ফলে কৃত্রিম এই জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে এবং প্রতি নিয়ত নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সরেজমিনে ওয়াব্রাং গ্রাম ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি কাঁচা ও আধাপাকা বাড়িতে কোমর সমান পানি থৈ থৈ করছে। হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘরের আসবাবপত্র, বিছানাপত্র, রান্নার সামগ্রী এবং গৃহস্থালির নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি অনেকেই।
অনেক দিনমজুর ও কৃষকের ঘরে মজুত করে রাখা চাল, ডাল, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পানিতে ভিজে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সোমবার দুপুর থেকে অধিকাংশ পরিবারে উনুন জ্বলেনি। তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষ। বিশেষ করে স্তন্যদায়ী মা, নবজাতক শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং পঙ্গু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। নিরাপদ পানির অভাবে এলাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ওয়াব্রাং গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা এবং ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় কোনো পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পানি নিষ্কাশনের যে দু-একটি প্রাকৃতিক খাল বা নালা ছিল, সেগুলোও স্থানীয় প্রভাবশালী এবং অপরিকল্পিত মাটি ভরাটের কারণে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হতেই পুরো ওয়াব্রাং গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এবারের টানা ও ভারী বর্ষণে পরিস্থিতি অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্রামের বাসিন্দা সোলেমান আহমেদ বলেন, "আমরা বছরের পর বছর ধরে এই ড্রেনেজ সমস্যার কথা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলে আসছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আজ সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই আমাদের ঘরবাড়ি পানির নিচে। ঘরের ভেতর পানি ঢুকে সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে খাটের ওপর বসে আছি। রান্না করার মতো কোনো অবস্থা নেই।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু মানুষের দুর্ভোগই বাড়েনি, খামারি এবং কৃষকদেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের বেশ কয়েকটি নিচু এলাকার মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে ভেসে গেছে, যার ফলে মৎস্য চাষীদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গোয়ালঘরে পানি ঢুকে পড়ায় গবাদি পশু (গরু, মহিষ, ছাগল) নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন মালিকেরা। চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় পশুখাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে শুকনো খড় কিনে পশুপাখিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হতে থাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী যদি আরও দুই-তিন দিন এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে, তবে পুরো হ্নীলা ইউনিয়নের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং জনদুর্ভোগ আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। প্লাবিত এলাকার মানুষ জরুরি ভিত্তিতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি এবং ওরাল স্যালাইন বিতরণের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে পানি যেন দ্রুত নেমে যেতে পারে, সেজন্য কালভার্ট ও নালার মুখে জমে থাকা আবর্জনা এবং অবৈধ বাঁধ অপসারণে প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
হ্নীলা ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জানান, "ওয়াব্রাং গ্রামের জলাবদ্ধতার খবর আমরা পেয়েছি। বৃষ্টির পানি আটকে থাকার মূল কারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটি। আমরা উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। পানিবন্দি পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে দ্রুত সরকারি সাহায্য বা শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় টেকনাফসহ উপকূলীয় এলাকায় আরও বজ্রসহ ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পাহাড় ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।