মো: আরাফাত মিয়া, জেলা জামালপুর,
জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলায় এক গৃহবধূকে অপহরণের পর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও কঠোর কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় এই মামলার অপর এক আসামিকে সসম্মানে খালাস দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) দুপুর ৩টায় জামালপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিজ্ঞ বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। এই রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ও সুশীল সমাজ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার পেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৫ সালের ২৫ মে রাতে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলার নিলক্ষীয়া এলাকায়। ওই রাতে ভুক্তভোগী গৃহবধূকে তার নিজ এলাকা থেকে একদল অপরাধী জোরপূর্বক অপহরণ করে। অপহরণের পর তাকে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আসামিরা পর্যায়ক্রমে ওই গৃহবধূর ওপর পাশবিক নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ চালায়। নৃশংস এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী গৃহবধূ ও তার পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনার পর পরই বকশীগঞ্জ থানায় হাজির হয়ে ভুক্তভোগী নিজে বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর বকশীগঞ্জ থানা পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ শুনানির পর অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় যে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তারা হলেন—রাশেদুর রহমান ওরফে পাপ্পু, বিজু মিয়া, বাদশা মিয়া, জুয়েল মিয়া, আশরাফুল ইসলাম, জসিম এবং আছমত। তারা সবাই বকশীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। আদালত তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ১ লাখ টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। অন্যদিকে, মামলার আট নম্বর আসামি ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ না পাওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক তাকে মামলা থেকে খালাস দেওয়ার নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অত্যন্ত দক্ষ আইনজীবী, অ্যাডভোকেট মো. ফজলুল হক মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলাটি আদালতে ওঠার পর রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আসামিদের অপরাধ প্রমাণে কাজ করেছে। মামলায় মোট নয়জন সাক্ষীর তালিকা দাখিল করা হয়েছিল, যার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাতজন সাক্ষী আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য প্রদান করেন।
আইনজীবী মো. ফজলুল হক আরও বলেন, "এটি একটি অত্যন্ত নৃশংস ঘটনা ছিল। আমরা আদালতকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, এই আসামিরা সমাজের জন্য চরম বিপজ্জনক। বিজ্ঞ বিচারক মামলার মেডিকেল বা চিকিৎসা প্রতিবেদন, অপরাধের আলামত, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করেছেন। সব প্রমাণাদি আসামিদের বিরুদ্ধে যাওয়ায় আদালত এই দৃষ্টান্তমূলক রায় ঘোষণা করেছেন। আমরা এই রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। জামালপুরের বকশীগঞ্জে এই রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে সাধারণ মানুষ এবং মানবাধিকার কর্মীদের ভিড় জমে যায়। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বলেন, এ ধরনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সমাজে অপরাধ প্রবণতা এবং নারীদের ওপর সহিংসতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিচার সম্পন্ন হওয়ায় তারা বিচার বিভাগের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তবে রায় ঘোষণার পরপরই কাঠগড়ায় থাকা আসামিরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা এই রায়ে ক্ষুব্ধ এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্টে) আপিল করবেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ মনে করছে, উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে। কারণ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ অত্যন্ত স্পষ্ট। বকশীগঞ্জের এই রায় দেশের সামগ্রিক নারী নিরাপত্তা এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।