মোঃ সুজন আহম্মেদ, ক্রাইম রিপোর্টার
পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মাদকের বিরুদ্ধে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলার মন্ডতোষ ইউনিয়নের মল্লিকচক গ্রামে মাদক সেবনের অকাট্য অপরাধ ও অভিযোগে পরিচালিত একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই যুবককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে অত্যন্ত গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই বিশেষ টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানটি পরিচালনা করেন ভাঙ্গুড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান। মাদকবিরোধী এই আকস্মিক অভিযানে অপরাধীদের হাতেনাতে আটক করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে এলাকায় স্বস্তি নেমে এসেছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্থানীয় বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে মন্ডতোষ ইউনিয়নের মল্লিকচক গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাদকসেবীদের আনাগোনা ও মাদক কেনাবেচার খবর আসছিল। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার রাতে উপজেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি যৌথ দল সেখানে অভিযান চালায়। অভিযান চলাকালীন মাদক সেবনের অকাট্য প্রমাণসহ দুই যুবককে আটক করা হয়।
আটককৃত ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন—মল্লিকচক গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে মো. শিহাব উদ্দিন (২৩) এবং একই গ্রামের মো. আফজাল সরকারের ছেলে মো. নাছিম উদ্দিন (২৭)। অপরাধস্থলে মাদকদ্রব্য সেবনের বিষয়টি সম্পূর্ণ প্রমাণিত হওয়ায় এবং আসামিরা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক তাদের দোষী সাব্যস্ত করেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান দেশের প্রচলিত 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮'-এর ৩৬(৫) ধারা মোতাবেক এই রায় ঘোষণা করেন। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার অধীনে অপরাধী মো. শিহাব উদ্দিন এবং মো. নাছিম উদ্দিন উভয়কেই ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। কারাদণ্ডের পাশাপাশি উভয় আসামিকে নগদ ৫০০ টাকা করে অর্থদণ্ড বা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আইনানুযায়ী অতিরিক্ত মেয়াদে সাজা ভোগের বিধান রাখা হয়েছে। সাজা ঘোষণার পর পরই আসামিদের আইনি প্রক্রিয়া মেনে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাদকবিরোধী এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ। ভাঙ্গুড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাকিউল আযম-এর সরাসরি নেতৃত্বে পুলিশের একটি দক্ষ ও চৌকস দল অভিযানে অংশ নেয়। দলে অন্যতম দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) সুব্রত কুমারসহ পুলিশের সশস্ত্র সদস্যরা। অভিযান চলাকালে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেদিকে পুলিশ কড়া নজরদারি রাখে।
সফল অভিযান সমাপ্তি শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে আলাপকালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান বলেন, “মাদক একটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধংসের মুখে ঠেলে দেয়। তরুণেরা যাতে মাদকের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত না হয়, সেজন্য আমাদের এই তৎপরতা। একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও সুস্থ সমাজ গঠনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই ধরনের কঠোর ও আকস্মিক অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে এবং কঠোরতার সাথে পরিচালিত হবে। মাদকের সাথে জড়িত কাউকেই কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
ভাঙ্গুড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাকিউল আযম জানান, এলাকায় সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ ও মাদক নির্মূলে পুলিশ প্রশাসন বদ্ধপরিকর। মাদকের সাথে জড়িত ব্যবসায়ী কিংবা সেবনকারী কারো কোনো রেহাই নেই। এই ধরনের অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এদিকে মল্লিকচক গ্রামে প্রশাসনের এই ঝটিকা অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সন্তোষ দেখা গেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকেরা জানান, যুবসমাজকে রক্ষা করতে এই ধরনের নিয়মিত অভিযান অত্যন্ত জরুরি। তারা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং ভাঙ্গুড়া উপজেলাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। এলাকার সচেতন নাগরিকদের মতে, শুধু সাজা প্রদানই নয়, মাদক সরবরাহের মূল হোতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।