জেলা প্রতিনিধি, পাবনা:
পাবনার ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য মকলেছুর রহমান বাবলু আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর আকস্মিক এই মৃত্যুতে পাবনা জেলাসহ সারা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মকলেছুর রহমান বাবলু দীর্ঘদিন ধরে নানাবিধ ক্রনিক ও জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় যাবৎ কিডনি রোগ, হৃদরোগ (হার্টের সমস্যা) এবং বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি ছিলেন। দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সময়ে তাঁর চিকিৎসাও করানো হয়েছিল। শনিবার দুপুর ১টার দিকে ঈশ্বরদী শহরের ফতেহমোহাম্মদপুর এলাকার নিজ বাসভবনে অবস্থানকালে তিনি হঠাৎ তীব্র অসুস্থতা বোধ করেন। বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা কোনো রকম দেরি না করে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁর চিকিৎসা শুরু করেন। তবে সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতাল থেকে মরদেহ তাঁর বাসভবনে নিয়ে আসার পর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে ফতেহমোহাম্মদপুরের বাসভবনে ভিড় জমান সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের চোখের জলে এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মকলেছুর রহমান বাবলুর জানাজার নামাজ শনিবার রাত ১০টায় ঈশ্বরদীর স্থানীয় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে (অথবা নির্ধারিত স্থানে) সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।
মকলেছুর রহমান বাবলু পাবনা জেলার রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রভাবশালী একজন মুখ ছিলেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা ঈশ্বরদী পৌরসভার মেয়র হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। পৌর মেয়র থাকাকালীন এলাকার রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সামাজিক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যা তাঁকে স্থানীয় মানুষের কাছে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও জনবান্ধব নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার কারণে দল তাঁকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদে আসীন করে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায় জুড়ে ছিল আইনি লড়াই ও কারাবাস। ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঐতিহাসিক ও বহুল আলোচিত মামলায় মকলেছুর রহমান বাবলুকে অন্যতম প্রধান আসামি করা হয়। নিম্ন আদালতের রায়ে এই মামলায় তাঁকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে এই রায় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে মকলেছুর রহমান বাবলুকে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর (৫.৫ বছর) অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বা কারাগারে বন্দি জীবন কাটাতে হয়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও উচ্চ আদালতে আপিলের পর অবশেষে ২০২৪ সালে আদালত এই মামলাটি খারিজ করে দেয়। মামলা খারিজ হওয়ার পর তিনিসহ এই মামলার অন্যান্য আসামিরা কারামুক্ত হয়ে সগৌরবে জনসম্মুখে ফিরে আসেন। কারামুক্তির পর তিনি আবারও ঈশ্বরদীর মাটিতে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছিলেন। তবে শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে বেশিদিন রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় থাকতে দেয়নি। মকলেছুর রহমান বাবলুর এমন আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণে পাবনা জেলা বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সংগঠনগুলোর মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব।
এক যৌথ শোকবার্তায় হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, মকলেছুর রহমান বাবলু ছিলেন ঈশ্বরদী তথা পাবনা জেলা বিএনপির এক আলোকবর্তিকা। তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়, সাহসী এবং রাজপথের এক নির্ভীক সৈনিক ছিলেন। মকলেছুর রহমান বাবলুর মতো একজন জনপ্রিয় ও কর্মীবান্ধব নেতাকে হারিয়ে আজ পাবনা জেলা বিএনপি অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। দলের প্রতিটি সংকটে তাঁর অবদান ও ত্যাগ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি তিনি যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।
একই সাথে শোকবার্তায় হাবিবুর রহমান হাবিব মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন এবং পরিবারের সদস্যদের এই কঠিন শোক সহ্য করার ধৈর্য ধারণের শক্তি প্রার্থনা করেন। এছাড়াও ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথক বিবৃতিতে মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পাশাপাশি ঈশ্বরদীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধিরাও সাবেক এই মেয়রের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরদীবাসী আজ তাদের একজন প্রিয় অভিভাবককে হারিয়ে শোকাভিভূত।