মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, ঢাকা জেলা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের বীমা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-র নতুন চেয়ারম্যান হিসাবে মীর নাদিয়া নিভিন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে দেশের বীমা অঙ্গনে শুরু হয়েছে এক নতুন ও চাঞ্চল্যকর আলোচনা। দেশের ইতিহাসে এই খাতের প্রথম নারী চেয়ারম্যান হিসেবে তার এই উচ্চপদে নিয়োগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বেশ কয়েকটি জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি আইডিআরএ কার্যালয়ে গিয়ে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা, অভিনন্দন বার্তা ও সৌজন্য সাক্ষাতের মাধ্যমে উষ্ণ স্বাগত জানিয়েছে। এর মধ্যে দেশের প্রথম সারির কিছু বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে সামনে এসেছে।
তবে এই আনুষ্ঠানিকতার মাঝেই বীমা মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে অন্য জায়গায়—যারা এখনো নতুন চেয়ারম্যানকে কোনো প্রকার শুভেচ্ছা বা অভিনন্দন জানায়নি, তারা আসলে কোথায়? দেশের এত বড় ও স্পর্শকাতর একটি খাতের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক পরিবর্তনের পর অনেক প্রভাবশালী কোম্পানির এই দৃশ্যমান নীরবতার কারণ কী? এটি কি কেবলই সময়ের অভাব কিংবা আনুষ্ঠানিক বিলম্ব, নাকি নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে বীমা খাতের বড় একটি অংশের মনে এখনো এক ধরনের দূরত্ব, অস্বস্তি কিংবা গভীর কোনো রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে? বীমা খাতের ভেতরে-বাইরে এমন নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন এখন তীব্রভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সৌজন্যতার আড়ালে অদৃশ্য দূরত্ব ও গ্রুপিংয়ের গুঞ্জন: সাধারণত দেশের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বা স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যখন নতুন কোনো চেয়ারম্যান বা প্রধান কর্মকর্তা নিয়োগ পান, তখন সংশ্লিষ্ট খাতের আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে সৌজন্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। এটি কেবলই কর্পোরেট বা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি পারস্পরিক পেশাগত সম্মান, প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি ইতিবাচক বার্তাও বহন করে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন দেশের সামগ্রিক বীমা খাত নানা সংকট, চরম গ্রাহক আস্থাহীনতা, কোটি কোটি টাকার বীমা দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘমেয়াদী জট এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার প্রশ্নে তীব্র চাপে রয়েছে—তখন নতুন চেয়ারম্যানের হাত ধরে পুরো খাতের একসঙ্গে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার দারুণ সুযোগ ছিল।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র প্রদর্শন করছে। কিছু কোম্পানি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলেও অনেক নামিদামি ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এখনো দৃশ্যত পুরোপুরি নীরব। এই নীরবতা নিছক ব্যস্ততার ফল—এমন সরল ব্যাখ্যা হয়তো আড়ালে দেওয়া যেতে পারে। তবে খাতের ভেতরের বোদ্ধারা বলছেন, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, দেশের বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, ক্ষমতার লবিং, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট অবস্থান ও প্রভাব বিস্তারের অদৃশ্য এক বলয় নিয়ে তুমুল আলোচনা রয়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগতেই পারে—অভিভাকহীনতার সুযোগ নেওয়া কেউ কেউ কি এখনো নতুন নিয়ন্ত্রকের গতিবিধি ও কঠোরতা পরিস্থিতি বুঝে নিতে চাইছেন? অনেকেই কি অপেক্ষা করছেন যে নতুন এই ক্ষমতার বাতাস শেষ পর্যন্ত কোন দিকে প্রবাহিত হয় তা দেখার জন্য? নাকি নতুন চেয়ারম্যানের সম্ভাব্য কঠোর সংস্কারমুখী অবস্থান অনেকের নিজস্ব অসাধু স্বার্থের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে—এই ভয়েই কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো সচেতনভাবে দূরত্ব বজায় রাখছে?
সংস্কারের বার্তা ও নতুন চেয়ারম্যানের চ্যালেঞ্জ: অবশ্য কেবল ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো বা না-জানানোর ওপরেই একটি খাতের ভালো-মন্দ বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিচার শেষ হয়ে যায় না। মূল আলোচনার বিষয় হলো, নতুন চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের ঝিমিয়ে পড়া বীমা খাত কতটা স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও সর্বোপরি জনআস্থাভিত্তিক টেকসই পথে এগিয়ে যেতে পারে। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে মীর নাদিয়া নিভিন দায়িত্ব নিয়েই তার প্রাথমিক বক্তব্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বছরের পর বছর ঝুলে থাকা গ্রাহকদের দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা, বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও আধুনিক ডিজিটাল তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে স্পষ্ট ও কড়া বার্তা দিয়েছেন।
এখন দেখার বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মে নিমজ্জিত থাকা বীমা কোম্পানিগুলো তার এই জনবান্ধব ও যুগান্তকারী উদ্যোগগুলোর পাশে কতটা আন্তরিকভাবে ও সততার সাথে দাঁড়ায়। কারণ, ক্যামেরার সামনে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো অত্যন্ত সহজ একটি কাজ; কিন্তু প্রকৃত এবং কার্যকর শুভেচ্ছা হবে তখনই, যখন প্রতিটি কোম্পানি আইন ও নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করবে, সাধারণ গ্রাহকদের লভ্যাংশ ও পলিসির দাবি সময়মতো দ্রুত পরিশোধ করবে এবং বাংলাদেশের ধ্বংসপ্রায় বীমা খাতকে পুনরায় মানুষের বিশ্বাসের ও আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনার কাজে প্রশাসনকে শতভাগ সহযোগিতা করবে।
বীমা খাতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে? নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যে তবুও প্রশ্নটি খাতের বোদ্ধাদের মনে বড় হয়েই দেখা দিয়েছে—যারা এখনো নতুন চেয়ারম্যানকে বরণ করে নিতে শুভেচ্ছা জানায়নি, তাদের এই রহস্যময় নীরবতা কি কেবলই আনুষ্ঠানিক বা প্রশাসনিক সময়ের সাধারণ বিলম্ব, নাকি এর আড়ালে রয়েছে নতুন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কোনো নীরব অসন্তোষ বা ভিন্ন কোনো প্রচ্ছন্ন সংকেত?
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে আইডিআরএ-র নতুন চেয়ারম্যানের ভূমিকা হবে অত্যন্ত জোরালো। তবে বীমা কোম্পানিগুলোর এই দ্বিমুখী ও ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থান খাতের ভেতরে এক ধরনের নীরব বিভক্তিকেই স্পষ্ট করে তুলছে। সামনের দিনগুলোতে নতুন নেতৃত্বের সংস্কারের লাঠি কতদূর এগোয় এবং নীরব থাকা কোম্পানিগুলো শেষ পর্যন্ত কেমন আচরণ করে, সময় এবং তাদের আগামী দিনের কর্মকাণ্ডই হয়তো এই সকল প্রশ্নের সঠিক ও অকাট্য উত্তর দেবে।