আঃ হালিম আতিক, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধি রক্ষা এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক বিশেষ অবৈধ জালবিরোধী মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালিত হয়েছে। এই সফল অভিযানে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আঠারোচূডা বিল থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বাজারমূল্যের ২২০০ মিটার নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর 'চায়না দুয়ারি' জাল জব্দ করার পর তা আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।
আজ সোমবার (২২ জুন ২০ Rome) দিনব্যাপী উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের পাহাড়ি অঞ্চলের আঠারোচূডা বিল এলাকায় এই বিশেষ অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। অভিযানটির নেতৃত্ব দেন ঘাটাইল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জায়েদ হোসাইন।
বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঝটিকা অভিযান: স্থানীয় মৎস্যজীবী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ঘাটাইলের বিভিন্ন প্লাবনভূমি, বিল ও জলাশয়ে নতুন পানি আসার সাথে সাথে দেশীয় প্রজাতির মা মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করেছে। এই সুযোগে কিছু অসাধু মৎস্য শিকারী ও মুনাফালোভী চক্র রসুলপুর ইউনিয়নের আঠারোচূডা বিলে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল পেতে অবাধে পোনামাছ এবং মা মাছ নিধন করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিষয়টি জানতে পেরে ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসন ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার দপ্তর যৌথভাবে এই মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়।
আজ সোমবার সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ জায়েদ হোসাইন এর নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি চৌকস দল আঠারোচূডা বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে ঝটিকা অভিযান শুরু করে। অভিযানে বিলের পানির তলদেশে সুকৌশলে পেতে রাখা ২২০০ মিটার দীর্ঘ ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল টেনে তোলা হয়। উদ্ধারকৃত জালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বলে নিশ্চিত করেছে মৎস্য বিভাগ।
জনসমক্ষে আগুন দিয়ে জাল ধ্বংস: অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের জন্য পাতা এই বিশাল পরিমাণ নিষিদ্ধ জাল জব্দের পর আঠারোচূডা বিল সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে সেখানে স্থানীয় রসুলপুর ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ জনসাধারণের উপস্থিতিতে জব্দকৃত নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালগুলো স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণরূপে ভস্মীভূত ও ধ্বংস করা হয়। এ সময় ক্ষতিকর এই জালের অপকারিতা সম্পর্কে উপস্থিত স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়।
অভিযান পরিচালনাকালে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেন। তবে অভিযানের টের পেয়ে অবৈধ জাল পাতার সাথে জড়িত অসাধু চক্রের সদস্যরা আগেই নৌকা নিয়ে বিলের গহীন এলাকায় পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি।
চায়না দুয়ারি জালের ভয়াবহতা ও মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য: অভিযান শেষে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, চায়না দুয়ারি জাল আমাদের উন্মুক্ত জলাশয়, নদী-নালা ও বিলের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক চরম অভিশাপ। এই জালের চোখ বা ছিদ্র এতই ছোট ও সুক্ষ্ম যে, এর ভেতর দিয়ে কোনো জলজ প্রাণী বা মাছের পোনা বের হতে পারে না। ফলে পোনামাছ, মা মাছ, কুঁচে, কাঁকড়া, ব্যাঙসহ পানির তলদেশের সমস্ত জীববৈচিত্র্য এই জালে আটকে মারা যায়।
এটি দেশীয় প্রজাতির মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির ধারাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দেশীয় মৎস্য সম্পদকে রক্ষা করতে এবং সরকারের মৎস্য আইন বাস্তবায়নে প্রশাসনের এই ধরণের কঠোর ও আপসহীন অভিযান ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে। কোনোভাবেই দেশের প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডার ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না।
উপজেলা প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি: অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ জায়েদ হোসাইন বলেন, "অবৈধ ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার দেশের প্রচলিত মৎস্য আইনের পরিষ্কার লঙ্ঘন। আঠারোচূডা বিলে আজ ২২০০ মিটার নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। যারা জেনেশুনে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করছে, তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে। ভবিষ্যতে জালের মালিকদের চিহ্নিত করে কঠোর জরিমানাসহ কারাদণ্ড প্রদান করা হবে।"
ডিমওয়ালা মা মাছ এবং পোনামাছ রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের এমন ঝটিকা ও সময়োপযোগী মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করায় রসুলপুর ইউনিয়নের সাধারণ জনগণ, সচেতন সমাজ ও প্রকৃত মৎস্যজীবীরা আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়রা এই বিলের মাছ রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি বজায় রাখার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।