মোঃ জসিম উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি’র আবাসিক ছাত্রাবাসে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখার বর্বরোচিত অভিযোগ উঠেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। নিহত শিক্ষার্থীর নাম মেহেদী হাসান (১৫)। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে অভিযুক্তরা।
এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নিহতের মরদেহ নিয়ে রামগঞ্জ থানা ঘেরাও করেছেন ক্ষুব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী। গতকাল বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) দুপুরে এই থানা ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি থমথমে থাকায় ও ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি আগামী সাত দিনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
আইফোন চুরির মিথ্যা অপবাদ ও নির্মম নির্যাতন: নিহত মেহেদী হাসান রামগঞ্জ পৌরসভার সোনাপুর এলাকার স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিনের ছেলে। সে একাডেমির আবাসিক হস্টেলের ৪১৪ নম্বর কক্ষের নিয়মিত ছাত্র ছিল। পরিবারের অভিযোগ এবং ছাত্রাবাস সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুন ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির কলেজ শাখার এক শিক্ষার্থীর একটি দামী ‘আইফোন’ হারিয়ে যায়। কোনো প্রকার তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান ফোনটি চুরি করেছে বলে অপবাদ দেওয়া হয়।
এই চুরির মিথ্যা অপবাদকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন ২০২৬) সন্ধ্যায় ফোন হারানো ওই কলেজ ছাত্রসহ মোট ৯ জন সিনিয়র শিক্ষার্থী মিলে এক অনৈতিক ও নৃশংস পরিকল্পনা করে। তারা মেহেদীকে তার নিজের কক্ষ থেকে ডেকে পাশের ৪১৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে দরজা বন্ধ করে চুরির স্বীকারোক্তি আদায়ের নামে মেহেদীর ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
হত্যা নিশ্চিতের পর লাশ ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার নাটক: নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাডেমির ছাত্রাবাসের দুজন আবাসিক শিক্ষক গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, সিনিয়ররা মেহেদীকে লাঠিসোটা দিয়ে বেদম মারধর করে। একপর্যায়ে প্রচণ্ড মারধরের কারণে এবং শ্বাসরোধ হয়ে মেহেদী কক্ষের মেঝেতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মেহেদীর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘাতক সিনিয়ররা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য এক নিষ্ঠুর নাটক সাজায়। তারা মেহেদীর নিথর দেহটিকে কক্ষের সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে দেয় এবং বাইরে এসে মেহেদী ‘আত্মহত্যা’ করেছে বলে চারদিকে মিথ্যা প্রচার চালাতে থাকে।
পরে ছাত্রাবাসের শিক্ষকরা ঘটনা জানতে পেরে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মেহেদীকে উদ্ধার করে দ্রুত পাশের নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মেহেদীকে মৃত ঘোষণা করেন এবং জানান হাসপাতালে আনার অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
অভিযুক্তদের পলায়ন ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর থানা ঘেরাও: একাডেমির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মেহেদীর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হওয়ার সাথে সাথেই অভিযুক্ত ৯ জন সিনিয়র শিক্ষার্থী কৌশলে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রামগঞ্জে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ও এলাকাবাসী মঙ্গলবার রাতেই একাডেমির অভ্যন্তরে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
পরদিন বুধবার দুপুরে নিহতের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ এলাকায় আনা হলে স্বজন ও শত শত এলাকাবাসী ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা মেহেদীর মরদেহ বহনকারী গাড়ি নিয়ে সরাসরি রামগঞ্জ থানা ঘেরাও করেন। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে থানা প্রাঙ্গণে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনি পদক্ষেপ ও আসামীদের গ্রেফতারের জোরালো আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর বুধবার বিকেলেই সোনাপুর এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে মেহেদীর মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য: নোয়াখালীর চাটখিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সেকান্দার মোল্লা জানান, "আমরা চাটখিল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করি। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় নিহতের পিঠে ও গলায় স্পষ্ট আঘাত ও কালচে দাগ দেখা গেছে, যা থেকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি হত্যাকাণ্ড। পরে ময়নাতদন্তের সঠিক কারণ নিশ্চিতের জন্য মরদেহ নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছিল।
রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "মোবাইল চুরির অভিযোগে মেহেদী নামের ওই ছাত্রকে সিনিয়ররা মারধর করেছিল বলে আমরা প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি। তবে ঠিক কী কারণে এবং কীভাবে তার নিখুঁত মৃত্যু হয়েছে, তা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় জড়িত পলাতক ছাত্রদের আটকের জন্য পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী আতিকুর রহমান বলেন, "শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায়, উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে এবং ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি সাতদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।