সাহের আলী, রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও সচল ও বেগবান রাখা এবং প্রান্তিক পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (দাবি+) কর্মসূচির উদ্যোগে স্থানীয় গ্রামীণ নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনামূল্যে উন্নত জাতের মুরগির বাচ্চা বিতরণ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তা পালনের ওপর এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০ injection/২০২৬ খ্রি.) সকাল ১০টায় রৌমারী ব্র্যাক এরিয়া অফিস চত্বরে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি, নারীদের স্বাবলম্বী করা, সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন এবং পারিবারিক পুষ্টির ঘাটতি দূরীকরণে ব্র্যাকের এই দূরদর্শী উদ্যোগ স্থানীয় সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দক্ষতা বৃদ্ধিতে দিকনির্দেশনামূলক প্রশিক্ষণ: মুরগির বাচ্চা বিতরণের মূল অনুষ্ঠানের শুরুতে গ্রামীণ নারীদের হাঁস-মুরগি পালনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ করে তুলতে একটি তথ্যবহুল ও দিকনির্দেশনামূলক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কীভাবে ঘরোয়া পরিবেশে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মুরগি পালন করে শতভাগ লাভবান হওয়া যায়, তা এই কর্মশালায় শেখানো হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই কারিগরি প্রশিক্ষণটি অত্যন্ত চমৎকারভাবে পরিচালনা করেন রৌমারী ব্র্যাকের এরিয়া ম্যানেজার আজারুল ইসলাম। কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নারীদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন রৌমারী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রুবেল হোসাইন।
তিনি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মুরগি পালন, মুরগির বিভিন্ন মারাত্মক রোগবালাই প্রতিরোধে করণীয়, সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা, ভ্যাকসিনের সময়সূচি এবং প্রতিকূল আবহাওয়াতেও মুরগির সঠিক পরিচর্যার বিভিন্ন সহজ ও বাস্তবমুখী কৌশল নারীদের সামনে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন।
এ সময় প্রশিক্ষণ কর্মশালার বক্তারা বলেন, "আমাদের দেশের গ্রামীণ নারীরা অলস সময় পার না করে ঘরে বসেই অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে হাঁস-মুরগি পালন করতে পারেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন খুব সহজেই পরিবারের প্রতিদিনের পুষ্টি ও আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, অন্যদিকে ডিম ও প্রাপ্তবয়স্ক মুরগি বাজারে বিক্রির মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা নিজেদের জন্য একটি স্থায়ী ও বাড়তি আয়ের বড় সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।"
বিনামূল্যে ৪০০টি উন্নত জাতের মুরগি বিতরণ: সফলভাবে প্রশিক্ষণ কর্মশালা সমাপ্ত হওয়ার পর মাঠ পর্যায় থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্বাচিত ২০ জন সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক নারী সদস্যের মাঝে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত জাতের মোট ৪০০টি মুরগির বাচ্চা বিতরণ করা হয়। ব্র্যাকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি মুরগির বাচ্চা হস্তান্তরের পূর্বে যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে, যেন খামারি নারীরা এগুলো নিয়ে কোনো লোকসানের মুখে না পড়েন। সুস্থ-সবল এই বাচ্চাগুলো পেয়ে উপস্থিত নারীদের চোখে-মুখে আনন্দের হাসির ঝিলিক দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি বড় দল উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ব্র্যাকের এসইএলপি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রহমান, রৌমারী শাখা ব্যবস্থাপক হযরত, দাঁতভাঙ্গা শাখা ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম, সহকারী শাখা ব্যবস্থাপক মনিবুর রহমান, কর্তিমারী শাখা ব্যবস্থাপক রতন চন্দ্র সরকার এবং শিবেরডাঙ্গী শাখা ব্যবস্থাপক রুমি। তারা প্রত্যেকেই মাঠ পর্যায়ে নারীদের এই খামার পরিচালনায় সব ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
উপকারভোগী নারীদের বাঁধভাঙা আনন্দ ও প্রতিক্রিয়া: সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং কোনো ধরনের লবিং বা অর্থ ছাড়া এই সহায়তা পেয়ে উপকারভোগী নারীরা তাদের উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা উপকারভোগী ছকিনা খাতুন (৫০) তার আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “এই যুগে আইসা কোনো টাকা-পয়সা ছাড়া বিনামূল্যে এমন উন্নত জাতের মুরগি পামু, তা ভাববারই পারি নাই। ব্র্যাকের এই মুরগি পেয়ে আমি খুবই খুশি ও আনন্দিত।”
আরেক উপকারভোগী জামানে খাতুন (৪৫) দালালি ও ঘুষবিহীন এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রশংসা করে বলেন, “ব্র্যাকের এ কর্মসূচিতে আমাদের কোনো টাকা বা ঘুষ দিতে হয়নি। একদম লিস্টি অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মুরগি আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই মুরগিগুলো ঠিকমতো পারলে আমাদের সংসারের অভাব দূর হবে।”
একই সুর মেলালেন মালেকা খাতুন (৫২)। তিনি বলেন, “শুধু মুরগি দেওয়াই শেষ না, ব্র্যাকের স্যারেরা আমাগো সকাল থেইকা অনেক বড় বড় প্রশিক্ষণ দিছে। মুরগি পালন সম্পর্কে অনেক অজানা বিষয় আজকে শিখেছি। বিনামূল্যে উন্নত জাতের মুরগি আর এই শিক্ষা পেয়ে আমার খুব উপকার হইলো।”
উন্নয়নমুখী টেকসই লক্ষ্যমাত্রা ও ব্র্যাকের অঙ্গীকার: অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্র্যাক চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রৌমারীর মতো চরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এই কার্যক্রম নারীদের ভাগ্য বদলে বড় ভূমিকা রাখবে। আগামীতেও দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্র্যাকের এ ধরনের জনকল্যাণমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রম দেশজুড়ে অব্যাহত থাকবে বলে তারা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।