আঃ হালিম আতিক, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে (মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) আকস্মিক পরিদর্শন করে চরম অব্যবস্থাপনা, নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের চিকিৎসাসেবা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি। পরিদর্শনকালে দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পেয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. কামরুল কিবরিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। একই সাথে হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফেরাতে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের জন্য সব ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিলের কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন তিনি।
গতকাল বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ঢাকা থেকে সরাসরি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে পৌঁছান। তিনি হাসপাতালের বিভিন্ন পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ (আউটডোর), প্যাথলজি ল্যাব এবং শৌচাগার (টয়লেট) সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। এ সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগী ও তাদের সাথে আসা স্বজনদের সাথে সরাসরি কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি হাসপাতালের সার্বিক সেবা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সরকারি ওষুধ সরবরাহ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রকৃত চিত্র ও অভিযোগ শোনেন।
অর্ধশতাধিক চিকিৎসক ও কর্মী গায়েব, প্রতিমন্ত্রীর ক্ষোভ: হাসপাতাল প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে মোট ৩৩৫ জন চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে প্রতিমন্ত্রীর আকস্মিক হাজিরা চেকিংয়ের সময় দেখা যায়, রোস্টার ডিউটি থাকা সত্ত্বেও অর্ধশতাধিকেরও বেশি কর্মী কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। দুপুরের শিফটে অনেক ডাক্তারের কক্ষ ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা।
কর্মস্থলে এমন চরম ফাঁকিবাজি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. কামরুল কিবরিয়াকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন এবং তাকে শোকজের নির্দেশ দেন। অনুপস্থিত চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন নিয়ে যারা কর্মস্থলে ফাঁকি দেবেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কারও যদি এখানে সঠিকভাবে চাকরি করতে ইচ্ছে না হয়, তাহলে তারা অন্য জায়গায় চলে যান। কিন্তু টাঙ্গাইলের সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।"
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগের পাহাড়: এদিকে প্রতিমন্ত্রীর হাসপাতালে আসার খবর মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা শত শত সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন। তারা প্রতিমন্ত্রীর সামনে হাসপাতালের নানা অনিয়ম, পদে পদে ভোগান্তি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, বাইরে থেকে চড়া মূল্যে ওষুধ ও পরীক্ষা (টেস্ট) করাতে বাধ্য করা এবং নার্স ও স্টাফদের খারাপ ব্যবহারের অভিযোগের পাহাড় তুলে ধরেন।
ভুক্তভোগী রোগীদের এসব গুরুতর অভিযোগ শোনার পর প্রতিমন্ত্রী হাসপাতালের বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, "হাসপাতালের অবস্থা বর্তমানে এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এটিকে চিকিৎসালয় না বলে প্রায় পরিত্যক্ত ঘোষণার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া যায় না।"
নোংরা শৌচাগার ও প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা তলব: পরিদর্শনের সময় হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের শৌচাগারগুলোর (টয়লেট) নোংরা, দুর্গন্ধময় ও চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রতিমন্ত্রী। সাধারণ রোগীরা কীভাবে এমন নোংরা পরিবেশে থাকেন, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। পরে তিনি হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুসের কার্যালয়ে গিয়ে পরিচ্ছন্নতা খাতের বাজেট ও জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন এমন পরিবেশ, সে বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চান। হাসপাতালটিকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ঢেলে সাজানোর জন্য আলটিমেটাম দেন তিনি।
মাদকসেবী ও বহিরাগত রুখতে মোবাইল কোর্টের নির্দেশ: পরিদর্শন শেষে হাসপাতালে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের সাথেও কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। হাসপাতালে কীভাবে প্রতিনিয়ত মাদকসেবী, চোর ও বহিরাগত দালালদের অবাধ প্রবেশ ও আনাগোনা ঘটছে, সে বিষয়ে আনসার ও নিরাপত্তা কর্মীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সরকারি হাসপাতালের শৃঙ্খলা ও সাধারণ রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশনা দেন। হাসপাতালে কোনো দালাল বা বহিরাগত দেখামাত্রই যেন তাকে আইনের আওতায় আনা হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর এই আকস্মিক অ্যাকশনে টাঙ্গাইলের সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয় সচেতন মহল আশা করছেন, প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর পদক্ষেপের পর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচেতন হবেন এবং সাধারণ রোগীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত সরকারি চিকিৎসাসেবা ফিরে পাবেন।