মোঃ মামুন মোড়ল, জেলা প্রতিনিধি (নরসিংদী):
দেশজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নরসিংদীতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলা প্রশাসন, নরসিংদী সদর এবং মাধবদী পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে বুধবার এক বিশাল জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। “নিজ পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করি, ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ি”—এই সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। প্রশাসন ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারলে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
বুধবার সকালে মাধবদী পৌরসভা কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য ও সুসজ্জিত সচেতনতামূলক র্যালি বের করা হয়। র্যালিতে অংশগ্রহণকারীরা ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়, এডিস মশার প্রজননস্থল চেনার উপায় এবং করণীয় সম্বলিত বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড বহন করেন। প্ল্যাকার্ডগুলোতে "তিন দিনে একদিন, জমা পানি ফেলে দিন", "আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখি, ডেঙ্গুমুক্ত জীবন গড়ি" ইত্যাদি সচেতনতামূলক স্লোগান লেখা ছিল, যা পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। র্যালিটি মাধবদী শহরের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক ও আবাসিক সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো প্রদক্ষিণ শেষে র্যালিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত সভার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
আয়োজিত এই মহতী কর্মসূচিতে প্রধান নেতৃত্ব দেন মাধবদী পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও নরসিংদী সদর উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার। তাঁর উপস্থিতিতে পুরো কার্যক্রমে এক ভিন্ন গতি আসে। র্যালিতে আরও অংশ নেন নরসিংদী সদর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মাধবদী পৌরসভা ও উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় কাউন্সিলরবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ। এছাড়াও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ডেঙ্গু প্রতিরোধে একাত্মতা প্রকাশ করে এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।
র্যালি শেষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সচেতনতা সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক আসমা জাহান সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধে তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, "ডেঙ্গু একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি, তবে সঠিক সচেতনতা ও সতর্কতার মাধ্যমে একে সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। এডিস মশা মূলত আমাদের ঘরের ভেতরে বা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রথম কাজ হলো নিজেদের বাসাবাড়ি, ছাদ বাগান, ফুলের টব, এসি বা ফ্রিজের ট্রে এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।"
তিনি আরও অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, "শুধুমাত্র সরকারি উদ্যোগ, পৌরসভা কিংবা প্রশাসনের একার পক্ষে পুরোপুরি ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাদের সাধারণ জনগণ সচেতন হচ্ছেন এবং এই লড়াইয়ে নিজেদের যুক্ত করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবে না। জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা অসম্ভব। আসুন আমরা সবাই মিলে সচেতন হই, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি ডেঙ্গুমুক্ত, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তুলি।"
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা ও সামাজিক সংগঠনের বক্তারাও ডেঙ্গুর ভয়াবহতা নিয়ে আলোচনা করেন। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তারা জানান, ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। বক্তারা কেবল একদিনের র্যালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, মাধবদী পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে, পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মশার ওষুধ বা লার্ভিসাইড ছিটানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পৌর এলাকার ড্রেন, পরিত্যক্ত ডোবা ও ময়লার ভাগাড়গুলো দ্রুত পরিষ্কার করার জন্য পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রশাসন ও মাধবদী পৌরসভার এই যৌথ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাধবদী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, এ ধরনের কর্মসূচির ফলে সাধারণ মানুষ ও দোকানদারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে। জমে থাকা পানি যে মশার প্রজননক্ষেত্র, তা অনেকেই অবহেলা করতেন। প্রশাসনের এই তদারকি ও প্রচারণার ফলে এখন সবাই সতর্ক হবেন।
কর্মসূচির পরিশেষে পৌর প্রশাসক আসমা জাহান সরকার ঘোষণা করেন যে, মাধবদী পৌর এলাকায় যদি কোনো বাড়ি বা নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়, তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হবে। তাই তিনি সবাইকে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার জন্য চূড়ান্ত আহ্বান জানান।