মোহাম্মদ আরিফ, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের রামু উপজেলার ঈদগড়ে এক সাধারণ বাসচালককে অস্ত্র মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ, ধোঁয়াশা এবং নানা মুখরোচক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের দাবি, সুনির্দিষ্ট ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে আসামি মোহাম্মদ তারেকের হেফাজত থেকে একটি দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র এবং তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পুলিশের এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে সাজানো নাটক। মাদক উদ্ধারের কথা বলে ঘরে ঢুকে নাটকীয়ভাবে অস্ত্র উদ্ধার দেখানোর এই ঘটনাটি এখন রামু ও ঈদগড় এলাকায় টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।
রামু থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহার এবং আদালতের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ১৭ মে ২০২৬ তারিখ গভীর রাতে রামুর ঈদগড় ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোদালিয়াকাটা এলাকার একটি বসতঘরে এই বিতর্কিত অভিযানটি পরিচালনা করে রামু থানা পুলিশ। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এএসআই আব্দুল খালেক বাদী হয়ে থানায় একটি অস্ত্র মামলা দায়ের করেন।
মামলার বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে তারেকের অস্থায়ী বা শ্বশুরবাড়ির বসতঘরে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিকালে তারেকের হেফাজত থেকে একটি দেশীয় তৈরি একনলা কাঠের বাটযুক্ত এলজি (লাইট গান) এবং দুটি তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে রামু থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা রুজু করা হয়, যার জিআর মামলা নম্বর ৩৪৫/২০২৬ (রামু)। তবে এই মামলা দায়েরের পর থেকেই অভিযানের পটভূমি ও আলামত উদ্ধারের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সরেজমিনে ঈদগড় ও কোদালিয়াকাটা এলাকার একাধিক বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং দিনমজুরদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ তারেক দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ হিসেবে পরিচিত। সে মূলত বাস ও পিকআপচালক হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিল। স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, এর আগে কখনো কোনো প্রকার অস্ত্র, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা কোনো ধরনের অপরাধমূলক বা মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় তারেকের নাম ভুলেও শোনা যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি বলেন, "একজন সাধারণ এবং দরিদ্র পরিবহনশ্রমিকের ঘরের ভেতর থেকে হঠাৎ করে এলজি ও তাজা কার্তুজ উদ্ধারের গল্পটি আমাদের কাছে কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।" স্থানীয় বাসিন্দা নাজিমুদ্দিন এই বিষয়ে বলেন, “তারেক দীর্ঘদিন ধরে ঈদগাঁও এলাকায় তার পরিবার নিয়ে সৎভাবে বসবাস করছে। ঘটনার দিন সে তার শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। আর ঠিক সেই রাতেই নিখুঁত পরিকল্পনায় পুলিশ সেখানে হানা দিয়ে তাকে আটক করল। এই টাইমিংটাই বলে দেয় পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে।”
এই রহস্যজনক গ্রেপ্তারের পর কক্সবাজারের স্থানীয় একটি প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন তারেকের স্ত্রী রিনা আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর স্বামীকে একটি গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার জন্য এই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। রিনা আক্তারের দাবি, সম্প্রতি একটি যাত্রীবাহী বাস কেনার পর তার অংশীদারিত্ব (পার্টনারশিপ) এবং লভ্যাংশ বণ্টন নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে তাদের তীব্র পারিবারিক ও ব্যবসায়িক বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষরা তারেককে শায়েস্তা করার জন্য এবং ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ঘৃণ্য পথ বেছে নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রিনা আক্তার আরও একটি অত্যন্ত সন্দেহজনক পয়েন্ট তুলে ধরেন। তিনি জানান, অভিযানের দিন 'মুরশিদা' নামের এক রহস্যময়ী নারী কোনো কারণ ছাড়াই তাদের বাড়িতে অনবরত যাতায়াত করছিলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ওই নারী প্রায় ৮ থেকে ৯ বার তাদের ঘরে ঢুকেছেন এবং বের হয়েছেন। পরিবারের সন্দেহ, ওই নারী প্রতিপক্ষের চাল চালার অংশ হিসেবে হয়তো ঘরে গোপনে কোনো অবৈধ জিনিস রেখে এসেছিলেন বা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করছিলেন। এই মুরশিদা নামের নারীর ভূমিকা কেন তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
এই অভিযানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা প্রশ্নের জায়গাটি তৈরি হয়েছে অভিযানের ধরন নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের দাবি, পুলিশ যখন গভীর রাতে ঘরে প্রবেশ করে, তখন তারা বারবার বলছিল যে ঘরে ইয়াবা বা মাদক মজুদ রয়েছে। কিন্তু পুরো ঘর তল্লাশি করে কোনো মাদক না পেয়ে হঠাৎ করেই একটি অস্ত্র উদ্ধারের গল্প সাজানো হলো।
এই বিষয়ে অভিযানে সরাসরি অংশ নেওয়া রামু থানার এএসআই জহিরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার মূল সূত্রফাঁস করে দিয়ে বলেন, “আমরা রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় মূলত মাদকের সংবাদের ভিত্তিতেই ওই বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়েছিলাম। তবে অভিযানের সময় মাদকের পরিবর্তে অস্ত্র উদ্ধার হওয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
একই সুরে কথা বলেন রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়াও। তিনি বলেন, “মাদকের সংবাদের ভিত্তিতেই আমাদের টিম অভিযান চালায়। অভিযানের সময় ঘরে অস্ত্র পাওয়া গেছে, তাই আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কার বাড়িতে শত্রুতা আছে বা কে কী রেখেছে, তা পুলিশের আগাম জানার কথা নয়।” তবে মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, “তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সব বলা সম্ভব নয়। আমরা পরিবারের দাবি এবং পুলিশের অভিযান—দুটি বিষয়ই খতিয়ে দেখছি।”
বর্তমানে ঘটনাটিকে ঘিরে পুলিশ প্রশাসন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দাবি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। তারেকের স্ত্রী রিনা আক্তার দাবি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য, স্থানীয় শত্রু পক্ষ এবং ওই রহস্যময়ী নারী মুরশিদার মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড (CDR) এবং সাম্প্রতিক আর্থিক লেনদেনের তথ্য নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা হোক। কক্সবাজারের সর্বস্তরের পরিবহনশ্রমিক ও সাধারণ মানুষ এই আলোচিত মামলার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে কোনো নিরীহ শ্রমিকের জীবন জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে নষ্ট না হয়।