মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, ঢাকা জেলা প্রতিনিধি:
শিল্পাঞ্চল ঢাকার আশুলিয়ায় এক পোশাক কারখানার (গার্মেন্টস) কর্মীকে নির্মমভাবে মারধর করে গুরুতর আহত করা এবং তার পকেটে থাকা বেতনের নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই কারখানায় কর্মরত এক সহকর্মী ও তার ভাড়াটে সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই বর্বর হামলার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী। শুধু মারধর বা টাকা ছিনতাই-ই নয়, ঘটনা জানাজানি করলে বা পুলিশকে জানালে ওই গার্মেন্টস কর্মীকে প্রাণনাশের সুনির্দিষ্ট হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে আশুলিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী যুবক। ঘটনার পর থেকে এলাকায় শ্রমিকদের মাঝে এক ধরণের চাপা উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযোগ সূত্রে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভুক্তভোগী তরুণ মোঃ ফয়সাল আহমেদ আশুলিয়ার একটি স্বনামধন্য পোশাক কারখানায় ‘জুনিয়র কাটিংম্যান’ হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কর্মরত আছেন। একই কারখানায় তার সাথে কাজ করেন নাজমুল নামের আরেক যুবক। তুচ্ছ ও পারিবারিক কিছু ব্যক্তিগত কারণে ফয়সালের সাথে নাজমুলের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল।
ফয়সালের অভিযোগ, এই পূর্ব শত্রুতার জেরে নাজমুল কারখানার ভেতরে এবং বাইরে বিভিন্ন সময়ে তাকে একা পেয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করত এবং চাকরি খেয়ে ফেলার ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল। বিষয়টি কারখানার অভ্যন্তরীণ ও সাধারণ হওয়ায় ফয়সাল প্রথমে এটিকে খুব একটা পাত্তা দেননি এবং ঝামেলা এড়াতে নাজমুলকে এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু নাজমুল যে ভেতরে ভেতরে এত বড় হামলার ছক কষছিল, তা ফয়সালের ধারণার বাইরে ছিল।
লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী ফয়সাল উল্লেখ করেছেন, গত ৬ জুন শনিবার সন্ধ্যায় কারখানা থেকে প্রতিদিনের মতো ছুটি শেষে তিনি পায়ে হেঁটে নিজের ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন। রাত আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে তিনি আশুলিয়ার কবিরপুর এলাকার একটি নিরিবিলি ও অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তায় পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা নাজমুল এবং তার কয়েকজন অজ্ঞাতনামা উশৃঙ্খল সহযোগী ফয়সালের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে তার পথরোধ করে।
পথ আটকানোর পরপরই নাজমুল অত্যন্ত অশালীন ও নোংরা ভাষায় ফয়সালকে গালিগালাজ করতে শুরু করে। প্রকাশ্য রাস্তায় এভাবে গালিগালাজ করার কারণ জানতে চেয়ে ফয়সাল যখন ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করেন, তখন নাজমুল ও তার সহযোগীরা হিংস্র হয়ে ওঠে। তারা কোনো কিছু বোঝার আগেই ফয়সালের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা ফয়সালকে কিল, ঘুষি, লাথি মারার পাশাপাশি রাস্তার পাশে থাকা লাঠিসোটা দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। তাদের উপর্যুপরি মারধরে ফয়সালের শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ফয়সালের আর্তচিৎকারে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে চাইলে হামলাকারীরা তাদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখায়।
ভুক্তভোগী ফয়সালের দাবি, তিনি যখন মাটিতে পড়ে ব্যথায় কোঁকাচ্ছিলেন, তখন হামলার মূল হোতা নাজমুল ও তার সহযোগীরা জোরপূর্বক ফয়সালের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়। তারা ফয়সালের কষ্টের উপার্জিত বেতনের নগদ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। টাকা ছিনতাইয়ের পর ফয়সাল যাতে পুলিশ বা কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে মুখ না খোলেন, সেজন্য তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় নাজমুল। তারা হুমকি দিয়ে বলে, "যদি এই নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করিস, তবে তোকে আশুলিয়ায় আর আস্ত রাখব না, একবারে খুন করে লাশ গুম করে ফেলব।" এই বলে তারা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চম্পট দেয়।
হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় পথচারী ও কারখানার কয়েকজন সহকর্মী ফয়সালকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে ফয়সাল বাসায় ফিরে তার পরিবারের বড় ও অভিভাবক সদস্যদের সাথে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও পরামর্শ করেন।
পরিবারের সবুজ সংকেত পেয়ে এবং নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে ফয়সাল আহমেদ আশুলিয়া থানায় গিয়ে অভিযুক্ত নাজমুল ও তার সহযোগীদের নাম উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। ভুক্তভোগী ফয়সাল কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে গণমাধ্যমকে বলেন, "আমি সাধারণ চাকরি করে খাই। আমার কষ্টের টাকা তারা ছিনতাই করে নিয়ে গেছে, আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"
গার্মেন্টস কর্মীকে মারধর ও ছিনতাইয়ের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় আশুলিয়া থানা পুলিশের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, একজন গার্মেন্টস কর্মীর ওপর হামলার লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যেই একজন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ওসি আরও জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ করবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, দেশের শিল্পাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। অভিযোগের সত্যতা মিললেই অভিযুক্ত নাজমুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।