উজ্জ্বল মন্ডল, মাদারীপুর:
মাদারীপুর জেলা ও এর আশেপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরির সিন্ডিকেট চালিয়ে আসা এক দুর্ধর্ষ চোরকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং জেলা পুলিশের একটি চৌকস আভিযানিক দলের যৌথ অভিযানে এই চোরচক্রের অন্যতম হোতা মুন্না কাজীকে (২৮) হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই বিশেষ সাফল্যে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
শনিবার (০৬ জুন, ২০২৬ ইং) গভীর রাতে মাদারীপুরের শিবচর থানা এলাকায় এক বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে এই সংঘবদ্ধ চোরচক্রের সক্রিয় সদস্য মুন্না কাজীকে আটক করতে সক্ষম হয় যৌথবাহিনী। গ্রেফতারকৃত মুন্না কাজীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক চুরির মামলা রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছদ্মবেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারকৃত মুন্না কাজী মূলত গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানী উপজেলার শিবগাতী এলাকার সৈয়দ কাজীর ছেলে। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাদারীপুর জেলার শিবচর, রাজৈর এবং ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত চোর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা এবং এর আশেপাশের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা, হাসপাতাল ও সরকারি অফিসের সামনে পার্কিং করা মোটরসাইকেল টার্গেট করাই ছিল তাঁর মূল কাজ।
পুলিশের অপরাধ রেকর্ড শাখা ও তথ্যমতে, মুন্না কাজীর বিরুদ্ধে মাদারীপুরের শিবচর থানাসহ বিভিন্ন থানায় অন্তত ৬টি মোটরসাইকেল চুরির মামলা রয়েছে। প্রতিটি মামলার তদন্তেই এই চোরচক্রের প্রধান হিসেবে মুন্নার নাম উঠে আসে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে বেড়ালেও পুলিশ ও র্যাবের বিশেষ নজরদারিতে ছিলেন তিনি। অবশেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিখুঁত ফাঁদ পেতে যৌথবাহিনী তাকে মাদারীপুর থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
স্থানীয় সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মুন্না কাজী ও তাঁর সহযোগীরা অত্যন্ত চতুর ও পেশাদার। তারা মূলত বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করত। একটি গ্রুপ ব্যস্ততম এলাকায় রেকি (R側に) করত, যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই বা মানুষের আনাগোনা কিছুটা কম। সুযোগ বুঝে মাস্টার কি (Master Key) বা বিশেষ প্রযুক্তির চাবি ব্যবহার করে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে যেকোনো মোটরসাইকেলের লক ভেঙে ফেলত মুন্না। এরপর তাঁর সহযোগীরা সেই চুরি হওয়া মোটরসাইকেলটি দ্রুত চালিয়ে অন্য জেলায় পাচার করে দিত।
চুরি করা এসব মোটরসাইকেলের চেসিস নম্বর ও ইঞ্জিন নম্বর পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেওয়া হতো। দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে মাদারীপুরের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালক ও প্রবাসীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বাড়ির সামনে বা বাজারের নিরাপদ স্থানে গাড়ি রেখেও রক্ষা পাচ্ছিলেন না কেউ। মুন্নার গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদারীপুর জেলাকে অপরাধমুক্ত এবং চুরি-ছিনতাই রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে এই যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটক মুন্না কাজীকে বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের নাম ও চোরাই বাইক কেনাবেচার গোপন আস্তানাগুলোর চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে।
পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা আরও জানান, মুন্নার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই চোরচক্রের অন্যান্য সক্রিয় সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা চোরাই মোটরসাইকেলগুলো উদ্ধার এবং এই চক্রের মূল হোতাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক আভিযানিক টিম মাঠে কাজ করছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই মেগা অভিযানের ফলে মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জ অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চোরচক্রের মূল হোতা ধরা পড়ায় মাদারীপুরের সচেতন মহল ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সমাজ র্যাব ও পুলিশ প্রশাসনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সংঘবদ্ধ মোটরসাইকেল চোরচক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই চলমান ও কঠোর অভিযান যদি নিয়মিত অব্যাহত থাকে, তবে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং ডাকাত দলের উৎপাত অনেকাংশে কমে আসবে। মানুষ শান্তিতে ও নিরাপদে তাদের মূল্যবান সম্পদ নিয়ে চলাচল করতে পারবে। গ্রেফতারকৃত মুন্না কাজীকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মাদারীপুর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।