মোঃ রাশিদুল ইসলাম (গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি)
মসজিদ হলো পবিত্র স্থান, যেখানে মানুষ আসে পরম শান্তি ও স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের আশায়। কিন্তু গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক পরম অমানবিক ও চরম হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এক অসহায় শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবককে। আল্লাহর ঘরে নামাজ পড়তে এসে বারবার চরম অমানবিকতার শিকার হচ্ছেন তিনি। নামাজে থাকা অবস্থায় বারবার চুরি বা নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে তার পথ চলার একমাত্র সম্বল হাতের লাঠিটি। সম্প্রতি নামাজ শেষে লাঠি না পেয়ে বাধ্য হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে একটি ব্যস্ত সড়ক পার হতে গিয়ে চলন্ত গাড়ির নিচে চাপা পড়া থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন এই যুবক। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় সচেতন মহল ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
চরম অমানবিকতার শিকার এই ভুক্তভোগী যুবকের নাম নাসিরুদ্দিন। তিনি গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার বলিয়াদী ইউনিয়নের অন্তর্গত শেওরাতলী গ্রামের বাসিন্দা। নাসিরুদ্দিন একসময়ের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং এলাকার সুপরিচিত ও সুনামধন্য ব্যক্তি মরহুম ছলিমুদ্দিনের ছেলে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে এক দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর শারীরিক সক্ষমতা হারান। বর্তমানে তীব্র শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো ধরনের কর্মসংস্থান করার সুযোগ নেই তাঁর। কোনো রোজগার না থাকায় সম্পূর্ণ অন্যের ওপর নির্ভর করে এবং একটি কাঠের লাঠিতে ভর দিয়ে অতি কষ্টে জীবন ধারণ করতে হয় তাকে। এই লাঠিটিই এখন তাঁর একমাত্র পা, তাঁর চলার পথের একমাত্র আশ্রয়।
স্থানীয় মুসল্লি, প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, নাসিরুদ্দিন একজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। নিজের গ্রাম ছেড়ে পায়ে হেঁটে অন্য গ্রামে অবস্থিত চন্ডিতলা জামে মসজিদে এসে তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চন্ডিতলা জামে মসজিদে নামাজ পড়তে আসার পর থেকে এক অদ্ভুত ও নোংরা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। নামাজে দাঁড়ানোর সময় তিনি তাঁর লাঠিটি মসজিদের এক কোণায় বা দরজার পাশে রেখে যান। কিন্তু প্রায় সময় দেখা যায়, নামাজ শেষে যখন সব মুসল্লি চলে যান, তখন নাসিরুদ্দিন তাঁর একমাত্র লাঠিটি আর খুঁজে পান না। কে বা কারা একজন অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষের এই অতি প্রয়োজনীয় লাঠিটি বারবার সরিয়ে নেয় বা চুরি করে, তা এখনও রহস্যের আবরণে ঢাকা।
প্রতিবন্ধী নাসিরুদ্দিনের এই লাঠি হারানোর বিষয়টি শুধু অমানবিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন তাঁর জীবনের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। গত কয়েক দিন আগে একইভাবে চন্ডিতলা জামে মসজিদে জোহরের নামাজ পড়তে আসেন নাসিরুদ্দিন। যথারীতি নামাজ শেষে তিনি দেখেন তাঁর লাঠিটি উধাও। দীর্ঘক্ষণ খোঁজাখুঁজি করেও লাঠিটি না পেয়ে তিনি নিরুপায় হয়ে পড়েন। তপ্ত রোদের মধ্যে লাঠি ছাড়া তাঁর পক্ষে এক কদম হাঁটাও অসম্ভব ছিল।
পরবর্তীতে তিনি বাধ্য হয়ে হাত ও পায়ের ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে কষ্ট সহ্য করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। চন্ডিতলা এলাকার একটি অত্যন্ত ব্যস্ত আঞ্চলিক সড়ক পার হওয়ার সময় লাঠিহীন নাসিরুদ্দিন ভারসাম্য হারিয়ে সড়কের মাঝখানে পড়ে যান। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই সড়ক দিয়ে একটি দ্রুতগামী ভারী যানবাহন আসছিল। গাড়িটি তাঁর একদম কাছাকাছি চলে এলেও চালক শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি ব্রেক চাপায় নাসিরুদ্দিন অলৌকিকভাবে রক্ষা পান। অল্পের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরেন তিনি। এই ঘটনার পর উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হতবাক হয়ে যান এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেন।
একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের চলার একমাত্র অবলম্বন পবিত্র মসজিদের ভেতর থেকে এভাবে বারবার চুরি বা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল, যুবক ও মুরব্বীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। চন্ডিতলা ও শেওরাতলী গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ চুরি নয়, এটি একটি মানসিক বিকৃতি এবং সামাজিক অবক্ষয়ের চরম দৃষ্টান্ত। মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এমন হীন কাজ কোনো সুস্থ মানুষ করতে পারে না।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এলাকাবাসী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা চন্ডিতলা জামে মসজিদ ম্যানেজিং কমিটি এবং স্থানীয় জনসাধারণের প্রতি জোরালো ও বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা দাবি তুলেছেন, মসজিদ কমিটি যেন অতি দ্রুত সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করে এই লাঠি চোরকে চিহ্নিত করে। একই সাথে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন নাসিরুদ্দিনের লাঠিসহ তাঁর কোনো জিনিসে কেউ হাত না দেয় এবং সমাজ যেন এই অসহায় যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে সার্বিক সহযোগিতা ও মানবিক আচরণ প্রদর্শন করে। একজন প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব। স্থানীয় প্রশাসনকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।