পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় পূর্ব শত্রুতার জেরে এক জামায়াত নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবিতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনতা ভাঙ্গুড়া থানা ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। শুক্রবার (২২ মে, ২০২৬) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নের দাশমরিচ এলাকায় এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নৃশংস এই হামলার শিকার জিল্লুর রহমান (৫০) দাশমরিচ গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি খানমরিচ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি এবং স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীদের মধ্যে আব্দুর রহমান (২৫) ও স্বপনসহ ৮-১০ জনের একটি দল এই ঘটনা ঘটিয়েছে। অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের দাবি, হামলাকারীরা বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তবে স্থানীয় সাধারণ জনগণ এবং উপজেলা বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, অভিযুক্ত আব্দুর রহমান ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে সাবেক শাসকদল আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা খোলস পাল্টানোর চেষ্টা করছে।
খানমরিচ ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হাফেজ আবুল কালাম ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, শুক্রবার সকালে জিল্লুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্য রাস্তায় কটূক্তি ও উস্কানিমূলক কথা বলে আব্দুর রহমান। এই নিয়ে উভয়ের মধ্যে তীব্র কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে জিল্লুর রহমানের সাথে থাকা এক সহযোগী ক্ষুব্ধ হয়ে আব্দুর রহমানকে একটি চড় মারেন। এই ঘটনার জেরে দুপুরের দিকে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জিল্লুর রহমানের বাড়িতে আকস্মিক হামলা চালায়। বাড়িতে জিল্লুর রহমানকে না পেয়ে হামলাকারীরা তার বৃদ্ধা মাকে বেদম মারধর ও লাঞ্ছিত করে বলে অভিযোগ ওঠে। এতেই ক্ষান্ত না হয়ে সশস্ত্র যুবকদের দলটি জিল্লুর রহমানকে খুঁজতে তার কর্মস্থল অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও হানা দেয়। কিন্তু সেখানেও তাকে না পেয়ে তারা রাস্তায় ওত পেতে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৮টার দিকে জিল্লুর রহমান কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে দাশমরিচ এলাকার নির্জন রাস্তায় পৌঁছালে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা আব্দুর রহমান, স্বপনসহ তাদের সশস্ত্র বাহিনী তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে জিল্লুর রহমানের মাথায় লক্ষ্য করে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। এতে তার মাথা গভীরভাবে কেটে যায় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
জিল্লুর রহমানের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা অস্ত্র উঁচিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে ভাঙ্গুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (সরকারি হাসপাতাল) নিয়ে যান। কিন্তু মাথার ক্ষত অত্যন্ত গভীর হওয়ায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। জিল্লুর রহমানের পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং তাকে রামেক হাসপাতালের আইসিইউ (ICU) সাপোর্টে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। জামায়াত নেতার ওপর এই নৃশংস হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতেই পাবনা-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মাননীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আলী আজগর শত শত দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতাকে সাথে নিয়ে ভাঙ্গুড়া থানা চত্বরে জড়ো হন। তারা জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন।বিক্ষোভ সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ সদস্য আলী আজগর বলেন, "আমার শান্তিকামী নেতা আজ রক্তাক্ত কেন, প্রশাসনকে এর জবাব দিতে হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় চাটমোহর-ভাঙ্গুড়ার তৌহিদী জনতা ও জামায়াত কর্মীরা রাজপথে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।" তার এই বক্তব্যের পর থানা চত্বরে ‘প্রশাসনের জবাব চাই’, ‘রক্তের বদলা রক্ত হবে’ ইত্যাদি স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে খানমরিচ ইউনিয়ন ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাদ্দাম হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, "অভিযুক্ত আব্দুর রহমান বা তার কোনো সহযোগী বিএনপি কিংবা ছাত্রদলের কোনো স্তরের রাজনীতির সাথেই সম্পৃক্ত নন। অহেতুক এই ঘটনায় বিএনপির নাম জড়ানো হচ্ছে।" তিনি দাবি করেন, কয়েকদিন আগে স্থানীয় এক জামায়াতকর্মীকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি অভ্যন্তরীণ ও সামাজিক বিরোধের জেরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে, এর সাথে দলীয় কোনো সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সակիউল আযম গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। এখন পর্যন্ত আহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাতেই অভিযুক্তদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। রাত ২টা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। বাকি মূল আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এলাকার পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।