মোঃ ইসরাফিল আজাদ, জেলা প্রতিনিধি
অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। তবে দেশের উত্তর জনপদের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে স্থানীয় এনজিওগুলোর দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক।
গত ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার) বিকেল ৪:০০ টায় ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের বিশেষ উদ্যোগে জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘এনজিও বিষয়ক সমন্বয় কমিটির’ এক গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। সভায় জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এনজিওগুলোর চলমান কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলার বিজ্ঞ জেলা প্রশাসক (ডিসি) জনাব মোঃ রফিকুল হক। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মাঠপর্যায়ের নানা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা শেয়ার করেন ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) জনাব সরদার মোস্তফা শাহীন।
এছাড়াও সভায় দেশের ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে আরডিআরএস (RDRS) বাংলাদেশ, ব্র্যাক (BRAC), ইএসডিও (ESDO), এবং পল্লী বীর উন্নয়ন সংস্থাসহ ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মরত বিভিন্ন এনজিওর প্রতিনিধি ও জেলা ব্যবস্থাপকগণ অংশগ্রহণ করেন।
সভার শুরুতে উপস্থিত সকলের সাথে কুশল ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ রফিকুল হক। এরপরই তিনি মূল কার্যসূচিতে প্রবেশ করে জেলার সমসাময়িক সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "ঠাকুরগাঁও জেলায় এনজিওগুলোর বড় ধরনের নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও বাল্যবিবাহের হার আশঙ্কাজনক এবং গ্রামীণ পরিবারগুলোতে জন্মনিয়ন্ত্রণ তথা পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার সন্তোষজনক নয়।
তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করে বলেন, এনজিও সংস্থাগুলো শহরকেন্দ্রিক ও নির্দিষ্ট কিছু ঋণ কার্যক্রমে বেশি মনোযোগী হলেও বাল্যবিবাহ রোধ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো অতি সংবেদনশীল ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সচেতনতামূলক বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করছে না।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে জেলা প্রশাসক রফিকুল হক সভায় উপস্থিত সকল এনজিও সংস্থাকে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, শুধু অফিস বা শহরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে সরাসরি প্রবেশ করতে হবে। গ্রামীণ নারীদের সচেতন করার পাশাপাশি ফ্যামিলি প্ল্যানিং বা পরিবার পরিকল্পনা নিশ্চিতকরণে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য তিনি এনজিও প্রধানদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের পর সভায় এনজিওগুলোর পক্ষ থেকে তাদের কিছু উন্নয়নমূলক কাজের চিত্র তুলে ধরা হয়। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এনজিও 'আরডিআরএস বাংলাদেশ'-এর সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণ বিভাগের সহযোগিতায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তার একটি তথ্যবহুল ভিডিও চিত্র (ভিডিও ডকুমেন্টারি) বড় পর্দায় প্রদর্শন করা হয়।
ভিডিও চিত্রে দেখানো হয় কীভাবে আরডিআরএস বাংলাদেশের সহায়তায় গ্রামের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ আজ স্বাবলম্বী এবং সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একই সাথে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলার ফেডারেশন ভিত্তিক অবহেলিত, দুস্থ মহিলা এবং শিশুদের জীবনমান উন্নয়ন, পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্যের বাস্তব চিত্র ও সফলতার গল্প সভায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়। উপস্থিত অতিথিবৃন্দ এই কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
সভার শেষ পর্যায়ে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ রফিকুল হক এনজিওগুলোর ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দেন যে, অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি সামাজিক মুক্তিও জরুরি। বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের জীবন শুধু ধ্বংসই করে না, বরং একটি পরিবারকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
তাই পরিশেষে, তিনি আরডিআরএস, ব্র্যাক, ইএসডিও-সহ ঠাকুরগাঁওয়ে কর্মরত সকল ছোট-বড় এনজিওকে বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। গ্রামীণ জনপদে নিয়মিত উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সহজলভ্য করার মাধ্যমে একটি বাল্যবিবাহ মুক্ত ও পরিকল্পিত ঠাকুরগাঁও জেলা গড়ার লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।