জসিম উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও কর্মক্ষেত্রে পদে পদে লাঞ্ছনা, অপমান আর চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন দেশের ওষুধ শিল্প খাতের অন্যতম চালিকাশক্তি—ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভরা। চাকরির নিশ্চয়তা, সম্মানজনক বেতন কাঠামো এবং কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশের দাবিতে এবার উত্তাল হয়ে উঠেছে লক্ষ্মীপুর। সোমবার (১১ মে) সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যালস রিপ্রেজেন্টেটিভস এসোসিয়েশন (ফারিয়া)’ লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ক্ষোভের কারণ:
বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন ওষুধ প্রতিনিধিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে চরমভাবে অপমান ও অপদস্ত করা হয়েছে। এই ঘটনাটি দেশের সকল ওষুধ প্রতিনিধিদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। তারা জানান, দেশের প্রতিটি প্রান্তে চিকিৎসাসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করলেও হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে তাদের প্রায়ই ‘দালাল’ বলে সম্বোধন করা হয়। একজন উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীর জন্য এর চেয়ে বড় অবমাননা আর কিছু হতে পারে না।
বক্তাদের বক্তব্য ও দাবি:
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “আমরা কোনো দয়া চাই না, আমরা আমাদের শ্রমের মর্যাদা চাই। দিনরাত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আমরা কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকার ব্যবসা নিশ্চিত করি, অথচ আমাদের নিজস্ব কোনো কর্মঘণ্টা নেই। সাপ্তাহিক ছুটি তো দূরের কথা, অসুস্থ হলেও আমাদের বিশ্রামের সুযোগ মেলে না। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় হলো, কোম্পানির পক্ষ থেকে আমাদের নিরাপত্তার জন্য কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নেই।”
লক্ষ্মীপুর সদর ফারিয়া ও ম্যানেজার ফোরামের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে নেতৃবৃন্দ সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি পেশ করেন:
১. ওষুধ প্রতিনিধিদের জন্য সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ও চাকরির নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
২. হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রবেশের সময় প্রতিনিধিদের ওপর হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৩. পেশাগত মর্যাদা রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে।
৪. কোম্পানির পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য বীমা ও ভবিষ্যৎ তহবিলের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ:
সমাবেশে উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন ফারিয়া সদর উপজেলা শাখার সভাপতি আরিফ মাহমুদ কাজল এবং সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন এরিয়া ম্যানেজার এসোসিয়েশন ফোরামের সভাপতি জসিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মো. মোশাররফ হোসেন। উপস্থিত ছিলেন সদস্য মো. ছরওয়ার হোসেন, রিয়াজুল ইসলামসহ জেলার কয়েকশ’ কর্মরত প্রতিনিধি।
স্মারকলিপি প্রদান:
মানববন্ধন শেষে প্রতিনিধিরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি অতি দ্রুত তাদের এই ন্যায্য দাবিগুলো মেনে নেওয়া না হয় এবং কর্মক্ষেত্রে সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, তবে আগামীতে সারা দেশে কর্মবিরতির মতো কঠোর কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হবেন তারা।
এই প্রতিবাদ সমাবেশটি কেবল একটি মানববন্ধন নয়, বরং দেশের হাজার হাজার ওষুধ প্রতিনিধির দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কোম্পানি মালিক পক্ষ এই অসহায় পেশাজীবীদের মানবিক দাবিগুলোর প্রতি কতটুকু কর্ণপাত করে।