বিশেষ প্রতিবেদক,
গাজীপুরের শ্রীপুরে সংরক্ষিত বনের গাছ নিধনের নেপথ্যে থাকা বন কর্মকর্তাদের দুর্নীতির থলে ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। ১ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আড়াল করতে এখন সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার অপচেষ্টায় নেমেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এমনকি নিউজ না করার জন্য সরকারি চাপের দোহাই দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর এক অদ্ভুত অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তা।
ঘুষের সাক্ষী যখন স-মিল মালিক নিজেই গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) রাজাবাড়ী এলাকায় রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জুয়েল রানা এবং সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ১ লক্ষ টাকা লেনদেনের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। করাতকল মালিক মো. মনির হোসেন প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন, রেঞ্জারকে ৫০ হাজার এবং বাকি কর্মকর্তাদের আরও ৫০ হাজার টাকা দিয়ে তিনি মুখ বন্ধ রেখেছেন।
সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করার ব্যর্থ চেষ্টা ও বিট কর্মকর্তার স্বীকারোক্তি এই অভিযোগের বিষয়ে সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি সবকিছু ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন সাংবাদিক তাকে জানান যে, ঘুষের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য এবং ভিডিও সাক্ষ্য (ভিডিও ফুটেজ) রয়েছে, তখনই বিট কর্মকর্তার সুর পাল্টে যায়। তিনি সরাসরি সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করার প্রস্তাব দেন।
সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করেন—“আপনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, তবে কেন আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন না?” তখন বিট কর্মকর্তা এক চাঞ্চল্যকর উত্তর দেন। তিনি বলেন:
"আমাদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপে সরকার সহায়তা করে না। তাই নিউজটি করবেন না। আমাদের বিষয়ে ভালো নিউজ হোক বা খারাপ—নিউজ হলে সরকার থেকে আমাদের ওপর অনেক চাপ আসে।"
প্রশাসনের অসংলগ্ন বয়ান: কে সত্য বলছে? এই ঘটনায় প্রশাসনের একেকজন একেক রকম তথ্য দিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করছেন:
রেঞ্জার জুয়েল রানা বলছেন, তিনি যাননি, অন্য কর্মকর্তারা গিয়েছেন।
বিট কর্মকর্তা বলছেন, ওইদিন কোনো বিট কর্মকর্তাই রাজাবাড়ী যাননি।
অথচ স-মিল মালিক বলছেন, তারা সবাই এসেছিলেন এবং ১ লক্ষ টাকা নিয়ে গেছেন।
প্রশাসনের এই লুকোচুরি খেলা প্রমাণ করে যে, বনের গাছ চুরির সিন্ডিকেটের সাথে কর্মকর্তাদের গভীর সখ্য রয়েছে।
বন যখন অনিরাপদ রক্ষকদের হাতে সচেতন মহলের প্রশ্ন, বন বিভাগের কর্মকর্তারা যদি নিজেদের ওপর ‘সরকারি চাপের’ দোহাই দিয়ে অপরাধীদের প্রশ্রয় দেন এবং সংবাদ চেপে যাওয়ার অনুরোধ করেন, তবে বনের নিরাপত্তা দেবে কে? ২০০৮ সাল থেকে চলমান এই অবৈধ করাতকলটি এখন শ্রীপুরের বনের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি স্থানীয়রা বলছেন, কর্মকর্তাদের এই অসহায়ত্বের নাটক আসলে ঘুষের টাকাকে জায়েজ করার একটি কৌশল মাত্র। অবিলম্বে সূর্যনারায়ণপুর বিট কর্মকর্তা ও রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জারের কললিস্ট এবং ওইদিনের গতিবিধি তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। শ্রীপুরের বন রক্ষায় অবিলম্বে এই অসাধু কর্মকর্তাদের অপসারণ এবং অবৈধ করাতকল উচ্ছেদের দাবি এখন তুঙ্গে।
[বি.দ্র: এশিয়া বার্তা’র কাছে কর্মকর্তাদের সাথে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এবং স-মিল মালিকের ভিডিও সাক্ষাৎকার সংরক্ষিত রয়েছে।]